
দৈনিক কালান্তর
প্রকাশিত: বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২৬
ঢাকা: দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক ইউনিট বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও অর্থনীতির মূল ভিত্তি এখনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপরই নির্ভরশীল। একই সঙ্গে প্রবাসী বিনিয়োগে বড় ধরনের পতন এবং বিদেশি ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান কমার চিত্র উঠে এসেছে অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অডিটরিয়ামে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহমান সাকি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ১৭ লাখ দুই হাজার ৭৯২। অর্থাৎ এক দশকে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির মধ্যেও ৮৬ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, ব্যবসা পরিচালনায় তাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা মূলধনের অভাব।
কর্মসংস্থানে মিশ্র চিত্র
বর্তমানে এসব ইউনিটে কর্মরত মানুষের সংখ্যা তিন কোটি ছয় লাখের বেশি, যা ২০১৩ সালের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। তবে বিদেশি ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ২৪.৫ শতাংশ।
২০১৩ সালে এই খাতে কর্মরত ছিল সাত লাখ ১৯ হাজার ৩৮৪ জন, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ৭০১ জনে।
প্রবাসী বিনিয়োগে বড় ধাক্কা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১১ বছরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ ৮৮ শতাংশ কমেছে। ২০১৩ সালে যেখানে প্রবাসী বিনিয়োগ ছিল ১ হাজার ৯৪২টি প্রতিষ্ঠানে, সেখানে ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ২২২টিতে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানও কমে গেছে প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি।
ক্ষুদ্র ও কুটির খাতই প্রধান শক্তি
দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আধিপত্য স্পষ্ট। মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে ক্ষুদ্র শিল্প ৫৬.৬৭ শতাংশ এবং কুটির শিল্প ৩৮.৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে মাঝারি শিল্প মাত্র ০.৩১ শতাংশ এবং বৃহৎ শিল্প ০.০৮ শতাংশ।
সেবা খাতের প্রাধান্য
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৯০ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক ইউনিট সেবা খাতে। এর মধ্যে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান মেরামত খাত এককভাবে প্রায় ৪২ শতাংশ দখল করে আছে।
মালিকানা কাঠামো
দেশের ৮৭.৩৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মালিকানাধীন। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি রয়েছে মাত্র ১.৮২ শতাংশ এবং অংশীদারিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ১.৪৪ শতাংশ।
ভৌগোলিক চিত্র
সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ঢাকা বিভাগে (২৭.৮ শতাংশ), এরপর চট্টগ্রাম (১৭.৫১ শতাংশ) ও রাজশাহী (১৪.৩৬ শতাংশ)। সবচেয়ে কম ইউনিট রয়েছে সিলেট বিভাগে (৪.৬৭ শতাংশ)।
গ্রামাঞ্চলে ইউনিট সংখ্যা বেশি হলেও কর্মসংস্থানে শহরের অবদান দ্রুত বাড়ছে।
নীতিনির্ধারণে বাস্তব তথ্যের গুরুত্ব
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, অতীতে পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে বাস্তবতা আড়াল করা হয়েছিল। এখন নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক চিত্র তুলে ধরা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এসব খাতকে সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রাখতে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।