ঢাকা জেলায় পৃথক অভিযানে ৬ মাসে ৮৪১টি মামলা, সাড়ে ৫ কোটি টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার

হেলাল শেখঃ ঢাকা জেলার গুরুত্বপূর্ণ সাতটি থানা এবং ঢাকা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) উত্তর ও দক্ষিণ শাখায় গত ছয় মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে উল্লেখযোগ্য তৎপরতার চিত্র উঠে এসেছে।

গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত সময়ে ঢাকা জেলা পুলিশ ৮৪১টি মাদক মামলা দায়ের করেছে। এতে প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ ৩৩ হাজার ৮২৯ টাকা মূল্যেমানের মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও ১১৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্য গুলো হলো- ২২৯ কেজি ৫৪১ গ্রাম গাঁজা, ৮৮ হাজার ৫৭১ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ২কেজি ২৩০ গ্রাম হেরোইন, ২০২ বোতল ফেন্সিডিল, ১৬ বোতল বিয়ার, ৩হাজার ৭৬৭ লিটার চোলাই মদ, ১০২ বোতল বিদেশি মদ, ৮৯৭ পিস বুফরেফিন ইনজেকশন, ২পিস প্যাথেডিন, ৮৫ বোতল চকো, ২হাজার ২০ পিস ট্যাফেনটাইল ট্যাবলেট ও ১০ বোতল ফায়ারডিল।

এর মধ্যে শুধু কেরানীগঞ্জ মডেল ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় প্রায় ২কোটি টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। ১৯২টি মামলা দায়ের করে ২৬৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ঢাকা জেলার সচেতন মহল বলছে, উদ্ধার ও মামলার সংখ্যা যেমন তৎপরতার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি এটি এলাকায় মাদক প্রবণতার বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইয়াবা বিস্তার উদ্বেগজনক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেরানীগঞ্জের স্থানীয় একজন শিক্ষক বলেন, শুধু গ্রেপ্তার নয়, স্কুল-কলেজভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি বাড়াতে হবে।

মাদক বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ভৌগলিক অবস্থান ও সংযোগ, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বস্তি এলাকা, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট, অপরাধচক্র ও সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়কে মূল কারণ হিসেবে দেখছে পুলিশ।

এবিষয়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, সাভার-আশুলিয়া থানা গার্মেন্টস ও শিল্পকারখানার ঘনত্ব এবং বাইরের জেলার বিপুল সংখ্যক শ্রমিকদের বসবাস। অন্যদিকে কেরানীগঞ্জ মডেল, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, দোহার ও নবাবগঞ্জ থানা নদীপথ (পদ্মা ও বুড়িগঙ্গা) এবং প্রত্যন্ত গ্রাম ও তুলনামূলক কম নজরদারির থাকায় মাদক আনা নেওয়ার সুযোগ সুবিধা জনক। এছাড়া ধামরাই থানার আংশিক শিল্পাঞ্চলের ঘনত্ব ও প্রত্যান্ত গ্রামীন রুট।

সবকয়টি থানায় রাজধানীর আশেপাশে এবং পরিবহন সুভিদা বেশি থাকায় শহর থেকে সহজে মাদক সরবরাহ করা যায়। অপরাধচক্র ও সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক স্থানীয় ও আন্তঃ জেলা চক্র সক্রিয় থাকে, যারা ছোট ডিলারদের মাধ্যমে বিস্তার ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করে।

এছাড়াও বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য যেমন, কর্মসংস্থানের অভাবে সহজ আয়ের আশায় মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে যুবকরা। পাশাপাশি গ্রাম ও আধা শহরে পুলিশের উপস্থিতি কম এবং পরিবার ও সমাজের নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া, খারাপ বন্ধু মহল এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, নিম্ন আয়ের মানুষ এবং বস্তি এলাকায় নজরদারী তুলনামূলক কম থাকায় এবং দ্রুত টাকা উপার্জন ও পারিবারিক ও মানসিক চাপের কারণে মাদক গ্রহন ও ব্যাবসা বেড়েছে।

তিনি আরও জানান, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, ঢাকা জেলা পুলিশ ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছে। গত ৬মাসে আমরা বিগত দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি মাদক উদ্ধার ও আসামি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি।

‘মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ঢাকা জেলা মাদকমুক্ত রাখতে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান পুলিশের ওই কর্মকর্তা।

এবিষয়ে ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ গণমাধ্যমকে জানান, প্রশাসনের দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গ, স্কুল-কলেজের শিক্ষক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে মাদক নির্মূল ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঢাকা জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, পারিবারিক, ধর্মীয় ও শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন আনতে পারলে শুধু মাদক নির্মূল নয় সকল প্রকার অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব।

আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রুবেল হাওলাদার জানান, মাদকের বিষয়ে সরকার “জিরো টলারেন্স” ঘোষণা করেছে, মাদক বিরোধী অভিযান অব্যাহত আছে, মাদকের সাথে জড়িত যেইহোক না কেন তাদেরকে আটক করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *