দেশে মাদকের ‘গডফাদার’ ১,৬২০, সক্রিয় ২০ হাজারের বেশি কারবারি

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়াবহ চিত্র, জিরো টলারেন্স নিয়েও প্রশ্ন

দৈনিক কালান্তর
প্রকাশিত: রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে মাদকের বিস্তৃত নেটওয়ার্কে অন্তত ১ হাজার ৬২০ জন ‘গডফাদার’ সক্রিয় রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে তিন স্তরে কাজ করছে ২০ হাজার ৮৯১ জন কারবারি। গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন ও লোকদেখানো অভিযানের কারণে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত সাফল্য আসছে না। হাজার কোটি টাকার এই অবৈধ বাণিজ্য এখনো শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তিন স্তরের নেটওয়ার্ক

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদক কারবারিদের মধ্যে—

  • গডফাদার: ১,৬২০ জন
  • পাইকারি কারবারি: ৬,২২৭ জন
  • খুচরা কারবারি: ১৩,০৪৪ জন

অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গডফাদারের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম (৩০৯ জন)। এরপর রাজশাহী (২৭৩), রংপুর (২৩৭), ঢাকা (২৩১), খুলনা (২২৮), বরিশাল (১১৭), ময়মনসিংহ (১১৫) ও সিলেট (১১০)।

পাইকারি ও খুচরা কারবারিতেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী অঞ্চল শীর্ষে রয়েছে।

সীমান্ত ও বিশেষ জোন

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কক্সবাজারের টেকনাফকে মাদক কারবারের অন্যতম ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের পাশাপাশি কুমিল্লাও মাদক পাচারের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত, যেখানে গাঁজা ও ফেনসিডিল পাচার বেশি হয়।

এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে গডফাদারদের পৃষ্ঠপোষক, অর্থলগ্নিকারী ও নিয়ন্ত্রকদের আলাদা তালিকা তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বিভিন্ন সংস্থার তালিকা

পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ একাধিক সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—

  • পুলিশের তালিকায়: ১৯,০৪৫ জন
  • বিজিবির তালিকায়: ৩,৯৬৪ জন
  • র‌্যাবের তালিকায়: ৩,০৭৬ জন

র‌্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের মধ্যে র‌্যাব-২ এলাকায় সর্বোচ্চ ৫৬৫ জন কারবারি শনাক্ত হয়েছে।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ বলেন,
“মাদকের বিরুদ্ধে র‌্যাব জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। অপরাধীর অন্য কোনো পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয় না।”

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন,
“মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিচালক (অপারেশনস) মো. বশির আহমেদ জানান,
“বিশেষ অভিযান, শীর্ষ কারবারি গ্রেপ্তার ও সরবরাহ চেইন ভাঙতে কাজ চলছে। কিছু অপারেশনাল সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

উদ্বেগ ও করণীয়

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান নয়, মাদক সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ভাঙতে না পারলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সরকার জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকায় মাদক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *