
দৈনিক কালান্তর
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: একসময় স্বচ্ছ ও নির্মল পানির জন্য খ্যাত শীতলক্ষ্যা নদী এখন মারাত্মক দূষণের কবলে পড়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন ও দখলদারির কারণে নদীর পানি কালো, দুর্গন্ধযুক্ত ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্প খাত হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, যে নদীর পানি একসময় ডাবের জলের সঙ্গে তুলনা করা হতো, এখন সেখানে আলকাতরার মতো কালো ও বিষাক্ত পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের চর সৈয়দপুর থেকে নরসিংদীর পলাশ পর্যন্ত নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্পকারখানা থেকে প্রতিদিন অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি লিটার শিল্পবর্জ্য বিভিন্ন নালা ও খালের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে মিশছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার বিপুল পরিমাণ পয়োবর্জ্য, যা কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই নদীতে পড়ছে।
ঐতিহ্যবাহী শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব
নদীর পানিদূষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানিশিল্প। স্থানীয় জামদানি কারিগর আক্তার হোসেন জানান, আগে নদীর পানি দিয়ে সুতা প্রক্রিয়াজাত করা হলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। এতে জামদানির মান ও বৈশিষ্ট্য নষ্ট হচ্ছে।
একইভাবে শীতলক্ষ্যার পানির ওপর নির্ভরশীল হোসিয়ারি ও নিট গার্মেন্ট শিল্পও চাপে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানির মান খারাপ হওয়ায় উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জীববৈচিত্র্যে বিপর্যয়
জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের তথ্যমতে, শীতলক্ষ্যায় প্রায় ৪৯০টি দূষণ উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ৪-৬ মিলিগ্রাম থাকার কথা থাকলেও তা নেমে এসেছে মাত্র ০.৫ মিলিগ্রামে। পাশাপাশি অ্যামোনিয়ার মাত্রাও সহনীয় সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
এর ফলে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর বসবাস প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে নদীর বহু প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
নজরদারির ঘাটতি
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩১৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ এইচ এম রাসেদ বলেন, “শীতলক্ষ্যা নদী শুধু শিল্পবর্জ্যে নয়, পয়োবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য ও নৌযানের বর্জ্য মিলিয়েই দূষিত হচ্ছে। যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই বা কার্যকর নয়, সেগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শীতলক্ষ্যা নদী সম্পূর্ণরূপে জীববৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়বে, যা দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।