২০ মাসে প্রাণ গেছে ৬৪৩ শিশুর: বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু নি*র্যা*তন ও হ*ত্যা

জনপদের খবর

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা

তারিখ: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬ | সময়: সকাল ০৭:৪৩

ঢাকা: দেশে কোমলমতি শিশুদের ওপর নির্মম নি/র্যা/তন ও হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। একের পর এক বর্বরোচিত ঘটনা সমাজকে স্তব্ধ করে দিলেও থামছে না এই নৃশংসতা। সাম্প্রতিক এক মানবাধিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো পরিসংখ্যান— গত ২০ মাসে সারা দেশে গড়ে প্রতি মাসে ৩২ জনেরও বেশি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।

দেশের অন্যতম মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সর্বশেষ বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞান ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত অপরাধীরা এমন জঘন্য অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে।

২০ মাসে ৬৪৩ শিশুর করুণ মৃ/ত্যু

এইচআরএসএসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত—এই ২০ মাসে সারা দেশে অন্তত ৬৪৩ জন শিশু নি/র্যা/তন ও সহিংসতার কারণে প্রা/ণ হারিয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই (জানুয়ারি-এপ্রিল) নির্মমভাবে নিহত হয়েছে ২০৩ জন শিশু। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র কয়েক মাসেই দেশজুড়ে ৪৭৮ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।

সংগঠনটির পরিসংখ্যান আরও বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে সারা দেশে অন্তত ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু মারাত্মক নি/র্যা/তনের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার৪০৭ জন শিশু তীব্র শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়, যার মধ্যে প্রাণ হারায় ৪৮৩ জন। একই সময়ে ৫৮০ জন শিশু জ/ঘ/ন্য ধ/র্ষ/ণ এবং ৩১৮ জন শিশু ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

পল্লবীর রামিসা ও মাগুরার আছিয়া: বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশু রামিসা আক্তারকে নিখুঁত পরিকল্পনায় ডেকে নিয়ে ধ/ণে/র পর নৃশংসভাবে হ/ত্যা করা হয়। বাথরুমের বালতি থেকে তার খণ্ডিত মাথা ও খাটের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রামিসার মা-বাবার বুকফাটা আর্তনাদ ও ক্ষোভ এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে তা নিয়ে কিছুদিন তোলপাড় চলে, কিন্তু আড়ালে থাকা অসংখ্য ঘটনা বছরের পর বছর ধরে হিমাগারে পড়ে থাকে। এমনকি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করা ঘটনাগুলোও সহজে বিচারের মুখ দেখে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাগুরায় চাঞ্চল্যকর শিশু আছিয়া ধ/র্ষ/ণ ও হত্যার ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী পরিবারটি এখনো চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

অপরাধ বাড়ার মূল কারণ কী?

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের মতে, এই ধরণের অমানবিক অপরাধ ক্রমাগত বাড়ার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে: ১. অপরাধের সঠিক, নিখুঁত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া।

২. বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা।

৩. দরিদ্র ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আইনি লড়াই বা মামলা চালানোর আর্থিক সামর্থ্যের অভাব।

৪. আইনের নানা ফাঁকফোকর ও রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি।

বিশ্লেষকদের দাবি, শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে শুধু আইন কাগজে-কলমে রাখলেই হবে না, বরং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব মামলার রায় স্বল্পতম সময়ে কার্যকর করতে হবে। একই সাথে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের বড় দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *