
জনপদের খবর
বিশেষ প্রতিবেদক | মোংলা
তারিখ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬ | সময়: রাত ১১:৫১
মোংলা: বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ধারাবাহিক ও সাঁড়াশি অভিযানের মুখে কোণঠাসা হয়ে অবশেষে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে সুন্দরবনের কুখ্যাত দস্যু ‘ছোট সুমন বাহিনী’। আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকাল ১০টায় কোস্টগার্ড বেইস মোংলায় এক জমকালো আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে এই বাহিনীর প্রধানসহ মোট ৭ সদস্য আত্মসমর্পণ করেন।
কোস্টগার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট সাব্বির আলম সুজন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনায় সুন্দরবন অঞ্চলকে দস্যুমুক্ত করতে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ জেলে, বাওয়ালি, মৌওয়ালি ও বনজীবীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” এবং “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামে দুটি বিশেষ ও বড় অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
যেভাবে এলো আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত
কোস্টগার্ডের কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত অভিযানের ফলে দস্যুরা সুন্দরবনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। টিকতে না পেরে একপর্যায়ে দস্যু ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা কোস্টগার্ডের নিকট আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
এরই ধারাবাহিকতায়, গত ১৭ মে রবিবার রাত ১১টায় বাগেরহাটের মোংলা থানাধীন সুন্দরবনের নন্দবালা খাল সংলগ্ন এলাকায় দস্যু ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার তার প্রধান ৬ সহযোগীসহ কোস্টগার্ডের কাছে প্রাথমিক ওয়ান-টু-ওয়ান যোগাযোগে ধরা দেয়। পরবর্তীতে আজ ২১ মে সকালে মোংলা বেইসে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা নেওয়া হয়। আত্মসমর্পণকালে তাদের কাছ থেকে ৩টি দেশীয় একনলা বন্দুক, ২টি দেশীয় পাইপগান, ২৫ রাউন্ড তাজা কার্তুজ এবং ৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ জব্দ করা হয়।
আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের পরিচয়
স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আলোয় পা রাখা এই ৭ দস্যুর মধ্যে ৬ জনই বাগেরহাটের মোংলা থানার এবং একজন রামপাল থানার বাসিন্দা। তারা হলেন— ১. সুমন হাওলাদার (৩২) — বাহিনী প্রধান
২. রবিউল মল্লিক (২৫)
৩. রফিক শেখ (২৯)
৪. সিদ্দিক হাওলাদার (৪০)
৫. গোলাম মল্লিক (৩৮)
৬. ইসমাইল খান (৩১) এবং
৭. মাহফুজ মল্লিক (৩৪) — রামপাল।
কোস্টগার্ড জানায়, এই চক্রটি দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে ও নদী-খালে ডাকাতি, সাধারণ জেলেদের অপহরণ এবং বাওয়ালিদের জিম্মি করে চড়া অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে আসছিল।
তিন মাসে ২১ বনদস্যু আটক, ২০ জিম্মি উদ্ধার
লেফটেন্যান্ট সাব্বির আলম সুজন আরও জানান, কোস্টগার্ড সুন্দরবনের শান্তি ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও কঠোর অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করছে। চলতি বছরের গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানের প্রেক্ষিতে আজ পর্যন্ত ২৬টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গোলা, ১৭৮ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ২৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৮৭ রাউন্ড এয়ারগান গোলা এবং ২টি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে মোট ২১ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে এবং দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ২০ জন সাধারণ জেলে-বনজীবীকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আজ আত্মসমর্পণকারী ৭ ডাকাতকে পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে থাকা পূর্বের মামলা ও পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড কর্তৃপক্ষ। সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত রাখতে এমন অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।