
জনপদের খবর
ক্রাইম রিপোর্টার | ঢাকা
তারিখ: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬ | সময়: দুপুর ০২:০০
ঢাকা: রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশু রামিসা আক্তারের ওপর নির্মম নি*র্যা*তন ও অবর্ণনীয় অপরাধের পর তাকে শেষ করে দেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আজই আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে যাচ্ছে পুলিশ।
আজ রবিবার (২৪ মে) দুপুরের পর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার চার্জশিট জমা দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ প্রশাসন।
আজ সকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা গতকাল শনিবারই (২৩ মে) মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত সিআইডির ডিএনএ টেস্টের (DNA Report) রিপোর্ট হাতে পেয়েছি। অভিযোগপত্রের বাকি কিছু আইনি ও দাপ্তরিক কাজ দ্রুততার সাথে চলছে। আজ রবিবারের মধ্যেই আমরা আদালতে এই ঘটনার মূল দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে জোরালো চার্জশিট দাখিল করব।”
যেভাবে প্রকাশ্যে আসে এই নির্মম ঘটনা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, নি*হ*ত ছোট্ট রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে নিজের ঘর থেকে বের হলে অভিযুক্ত সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে তাদের নিজেদের ঘরের ভেতরে নিয়ে যান।
এদিকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে গেলে তার মা তাকে চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া ওই আসামির ঘরের দরজার সামনে শিশু রামিসার ব্যবহৃত জুতো দেখতে পান তিনি। এতে সন্দেহ হলে দরজা ধাক্কাধাক্কি ও ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। পরে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা মিলে একজোট হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। শয়নকক্ষের ভেতরে প্রবেশ করতেই মেঝেতে ও ঘরের একটি বড় বালতির ভেতরে রামিসার নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহের বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা-বাবা।
তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল দেওয়া হলে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘর থেকে স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার মূল হোতা সোহেল রানা পালিয়ে যাওয়ায় পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষ সহায়তায় ওই রাতেই নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এই বর্বরোচিত ঘটনার পরদিন বুধবার ভুক্তভোগী শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন।
জবানবন্দিতে অপরাধের রোমহর্ষক বিবরণ, নেপথ্যে ছিল ‘মাদক’
গ্রেফতারের পর গত ২০ মে আদালতে হাজির করা হলে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা বিচারকের খাসকামরায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে একটি রোমহর্ষক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি জানান, ঘটনার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তিনি মারাত্মক ক্ষতিকর মাদক ‘ইয়াবা’ সেবন করেছিলেন। মাদকের তীব্র মরণনেশায় বুঁদ হয়ে থাকার কারণেই তিনি এই চরম বিকৃত মানসিকতার অপরাধটি ঘটান।
আদালতকে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে সোহেল জানান, ১৯ মে সকালে রামিসা তাদের ঘরের সামনে এলে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে ডেকে ভেতরে নেন। এরপর বাথরুমে নিয়ে শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হলে একপর্যায়ে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ঠিক ওই মুহূর্তে শিশুটির মা বাইরে থেকে দরজায় জোরে কড়া নাড়তে থাকেন। দরজার আওয়াজ শুনে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোহেল বাথরুমের ভেতরেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশুটিকে নির্মমভাবে শেষ করে দেন।
এরপর প্রমাণ ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে দেহ থেকে মাথা আলাদা করা হয় এবং দুই হাত আংশিক বিচ্ছিন্ন করে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। জবানবন্দিতে সে আরও উল্লেখ করে, পুরো ঘটনার সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার একই ঘরে উপস্থিত থেকে তাকে সহযোগিতা করেন এবং পরবর্তীতে জানালার গ্রিল কেটে তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালান। ঘাতক সোহেল আদালতকে স্পষ্ট জানায়, ভুক্তভোগী ওই শিশু বা তার পরিবারের সাথে তাদের পূর্বে কোনো ধরণের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক শত্রুতা ছিল না; সম্পূর্ণ মাদকের প্রভাবেই সে এই পৈশাচিক কাণ্ড ঘটিয়েছে।
নিষ্ঠুর এই ঘটনার পর থেকে পুরো মিরপুরসহ দেশজুড়ে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে তীব্র আন্দোলন ও মানববন্ধন চলছে। পুলিশ জানায়, বিজ্ঞানসম্মত ও প্রযুক্তিগত সমস্ত তথ্য-প্রমাণ অভিযোগপত্রে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।