ইসলামে বন্ধুত্ব ও বিরোধের মানদণ্ড: ইমান, ন্যায় ও তাকওয়া

ইমান, ন্যায় ও তাকওয়া
ইমান, ন্যায় ও তাকওয়া

দৈনিক কালান্তর
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্ম ও জীবন: মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব। সমাজে চলার পথে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং মতবিরোধ—সবই জীবনের অংশ। তবে ইসলাম এসব সম্পর্ককে শুধু আবেগ বা স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে দেয় না; বরং ইমান, নৈতিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই সম্পর্কের মূল মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “মুমিনগণ পরস্পরের বন্ধু ও সহায়ক; তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে” (সুরা তাওবা: ৭১)। অর্থাৎ প্রকৃত বন্ধুত্ব সেই, যা মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করে এবং ইমানকে শক্তিশালী করে।

ইসলামে তাকওয়া বা আল্লাহভীতিও বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কোরআনে বলা হয়েছে, “কিয়ামতের দিন বন্ধুরা পরস্পরের শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা ব্যতীত” (সুরা যুখরুফ: ৬৭)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালো ও খারাপ সঙ্গীর প্রভাব সম্পর্কে বলেন, “ভালো সঙ্গী সুগন্ধি বিক্রেতার মতো, আর খারাপ সঙ্গী কামারের মতো” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। অর্থাৎ সঙ্গ মানুষের চরিত্র ও জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

বিরোধেও থাকতে হবে ন্যায়

ইসলাম অকারণে শত্রুতা বা বিরোধিতাকে সমর্থন করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে; ন্যায়বিচার করো, এটিই তাকওয়ার নিকটবর্তী” (সুরা মায়েদা: ৮)।

বিশ্লেষকদের মতে, অযৌক্তিক বিরোধ সমাজে বিভেদ, হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এবং ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ক্ষমা ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্ব

ইসলাম শত্রুতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে উৎসাহ দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে সে তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন রাখবে” (সহিহ বুখারি)।

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট ছিল। তারা মতের পার্থক্যকে কখনো ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত করেননি।

আল্লাহর জন্য ভালোবাসার মর্যাদা

হাদিসে বর্ণিত আছে, কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভ করবে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো—যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসে এবং আল্লাহর জন্যই মিলিত ও বিচ্ছিন্ন হয় (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, “মানুষ যার সঙ্গে ভালোবাসা রাখে, কিয়ামতের দিন সে তার সঙ্গেই থাকবে।”

আধুনিক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

বর্তমান যুগে বন্ধুত্ব অনেক সময় স্বার্থ, অর্থ বা সাময়িক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আবার সামান্য মতভেদেই সম্পর্ক ভেঙে যায় বা শত্রুতায় রূপ নেয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।

ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামের শিক্ষা হলো—বন্ধুত্ব হবে নৈতিকতা ও ঈমানের ভিত্তিতে, আর বিরোধ হবে ন্যায় ও সত্যের জন্য। অহেতুক শত্রুতা বা ব্যক্তিগত স্বার্থে বিরোধিতা ইসলাম সমর্থন করে না।

তারা বলেন, মানুষের উচিত সৎ ও নেককারদের সঙ্গ গ্রহণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সব সম্পর্কের কেন্দ্রে রাখা। তবেই সমাজে শান্তি, ন্যায় ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

লেখক: গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *