
জনপদের খবর
ধর্মীয় প্রতিবেদক | ঢাকা
তারিখ: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬
ঢাকা: ইসলাম ধর্মে আত্মত্যাগের এক মহান উৎসবের নাম পবিত্র ঈদুল আজহা, যা আমাদের দেশে সাধারণত ‘কোরবানির ঈদ’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর চরম ত্যাগ ও আনুগত্যের এক ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণ।
কোরবানি মূলত হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর রেখে যাওয়া একটি সুন্নত। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) একবার মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই কোরবানি কী?” উত্তরে তিনি ইরশাদ করেন, “এটি তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত।” (আবু দাউদ)।
ত্যাগের ঐতিহাসিক পটভূমি
কোরবানির এই বিধানের পেছনে রয়েছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর চরম ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা, যা পবিত্র কোরআনের সুরা সাফফাতের ১০২ থেকে ১০৫ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাইলকে মিনার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে কোরবানি করার উদ্দেশ্যে নিজ হাতে তাঁর গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন, তখন আল্লাহ তায়ালা পিতা ও পুত্রের এই অসীম আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে যান। আল্লাহর কুদরতে ইসমাইল (আ.) রক্ষা পান এবং তাঁর পরিবর্তে বেহেশত থেকে প্রেরিত একটি দুম্বা কোরবানি হয়। সেই ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ পশু কোরবানি করে থাকেন।
কোরবানির অসীম ফজিলত
হাদিস শরিফে কোরবানির ফজিলত সম্পর্কে চমৎকার বর্ণনা রয়েছে। রাসুল (সা.) তাঁর কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)-কে কোরবানির সময় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “এই কোরবানির প্রথম রক্তবিন্দু প্রবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা তোমার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, এই বিপুল ফজিলত শুধু আহলে বাইতের (নবীর পরিবার) জন্য নয়, বরং পৃথিবীর সব মুসলিমের জন্যই প্রযোজ্য। (মুসনাদে বাজজার, আত্তারগিব ওয়াত্তারহিব)।
তবে যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালন করে না, তাদের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তির কোরবানির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।” (মুস্তাদরাকে হাকেম)।
কোরবানির কিছু জরুরি ও প্রয়োজনীয় মাসয়ালা
কোরবানি শুদ্ধ হওয়ার জন্য ইসলামী শরিয়তে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও মাসয়ালা রয়েছে। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাসয়ালা তুলে ধরা হলো:
- যাদের ওপর ওয়াজিব: জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ফজর থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের নর-নারীর কাছে যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে ৫২ তোলা রুপার সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। এই নিসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়, শুধু কোরবানির তিন দিন থাকলেই ওয়াজিব হবে।
- কোরবানির সময়: জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত—এই মোট তিন দিন কোরবানি করা যায়। তবে প্রথম দিন (১০ জিলহজ) কোরবানি করা সর্বোত্তম।
- কোন পশু কোরবানি করা যাবে: উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। বন্য পশু যেমন হরিণ বা বন্য গরু দিয়ে কোরবানি বৈধ নয়।
- পশুর বয়স: কোরবানির উট কমপক্ষে ৫ বছরের, গরু ও মহিষ ২ বছরের এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বার বয়স ৬ মাসের বেশি হলে এবং দেখতে এক বছরের মতো হৃষ্টপুষ্ট মনে হলে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ।
- অংশগ্রহণ বা শরিকানা: একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দিয়ে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি কোরবানি দিতে পারবেন। তবে উট, গরু বা মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হয়ে কোরবানি দিতে পারবেন।
যদি কেউ কোরবানির নির্দিষ্ট দিনগুলোতে ওয়াজিব কোরবানি দিতে ব্যর্থ হন, তবে পরবর্তীতে তাকে কোরবানির উপযুক্ত একটি ভাগের মূল্য গরিবদের মাঝে সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব বলে ফিকাহ শাস্ত্রের গ্রন্থগুলো (বাদায়েউস সানায়ে, কাজিখান) উল্লেখ করেছে।