ঢাকা , শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
খুলনায় র‍্যাবের অ্যাকশন: রিয়া বাজারে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ দুই অস্ত্রধারী আটক খুলনায় নিজ কন্যাকে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিলেন মা শিমা মেথিকান্দা স্টেশনের ‘বুবি’ আর হাসবেন না: ৪০ হাজার টাকার জন্য বোবা নারীকে পিটিয়ে হত্যা! শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা: চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজ বিকেল ৪টায় ভারতে প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত জনজীবন: একদিনেই প্রাণ গেল ১০ জনের রিজার্ভারে ঢুকছে বন্যার পানি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে জরুরি সতর্কতা জারি চট্টগ্রাম ওয়াসা’র দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি: ৯ পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে ৫ নদীর পানি পার্বত্য চট্টগ্রামে দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর তৎপরতা: আটকে পড়া পর্যটক উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ ব্যাটিং ব্যর্থতার চিরচেনা রূপ: ১৩ রানের হারে জিম্বাবুয়ের কাছে সিরিজ খোয়াল বাংলাদেশ সুরের আকাশে নক্ষত্রপতন: ৭৫ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন পপ আইকন বনি টাইলার বন্ধ কারখানায় ১০৫০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ: তৈরি হবে ৩ হাজার কর্মসংস্থান যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ হামলা, মার্কিন ঘাঁটিতে তেহরানের পাল্টা আঘাত ফিতনার এই যুগে ঈমান রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: জুমার মিম্বর থেকে বিশেষ বার্তা পেনাল্টি মিসের হতাশা ভুলে এমবাপ্পের বিশ্বরেকর্ড, মরক্কোকে হারিয়ে সেমিতে ফ্রান্স এমবাপ্পে-দেম্বেলের ঝলক: মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ফ্রান্স

হাতের মুঠোয় সর্বনাশা অনলাইন জুয়া: কিশোর থেকে বৃদ্ধ সর্বস্বান্ত, পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা

জনপদের খবর

সাংবাদিক আল আমিন কাজী | বিশেষ প্রতিবেদন

তারিখ: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

ঢাকা: একসময় ‘জুয়া’ বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠত তাসের আড্ডা, কোনো নির্জন ক্লাব কিংবা ঘরের কোণে বসা গোপন আসর। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় সেই চিরাচরিত চিত্র এখন খোলস বদলেছে। অন্ধকার ঘরের জুয়ার আসর এখন উঠে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়, স্মার্টফোনের চকচকে পর্দায়। মোবাইল অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে দেশজুড়ে জাল বিছিয়েছে এক ভয়ংকর অনলাইন বেটিং বা ডিজিটাল জুয়ার সিন্ডিকেট। এই মরণনেশায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার।

সব বয়সী মানুষ এখন ঝুঁকিতে, বাদ যাচ্ছে না স্কুলপড়ুয়ারাও

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অনলাইন জুয়ার ফাঁদ এতটাই সুনিপুণ যে, কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও এখন এই চক্রের প্রধান শিকারে পরিণত হয়েছে। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কিংবা পড়াশোনার খরচের কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারা মেতে উঠছে এই সর্বনাশা খেলায়।

সহজেই রাতারাতি বড়লোক হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এসব জুয়ার অ্যাপের বিজ্ঞাপন ছড়ানো হচ্ছে। সেখানে নামী-দামী তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে বিভ্রান্তিকর প্রমোশনাল কনটেন্ট, যা দেখে খুব সহজেই প্রলুব্ধ হচ্ছে সাধারণ মানুষ।


মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহজ লেনদেন

অনলাইন জুয়া এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো এর সহজ লেনদেন প্রক্রিয়া। দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবা (MFS) যেমন—বিকাশ ও নগদের ব্যক্তিগত এবং মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এই জুয়ার টাকা লেনদেন হচ্ছে। জুয়ার সাইটগুলোতে টাকা জমা দেওয়া (ডিপোজিট) এবং টাকা তোলা (উইথড্র) এত বেশি সহজ করা হয়েছে যে, প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সাধারণ মানুষও কোনো ঝক্কি ছাড়াই এই জুয়ার আসরে যুক্ত হতে পারছে। স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ‘এজেন্ট’, যারা গোপনে এই ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউটের প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে।

কেউ হারাচ্ছেন বসতভিটা, কেউ বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ

এই সর্বনাশা ডিজিটাল জুয়া শুধু মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ই ঘটাচ্ছে না, বরং সামাজিক ও পারিবারিক অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। জুয়ায় হেরে কেউ ব্যবসার মূলধন খোয়াচ্ছেন, কেউ শেষ সম্বল বসতভিটা বন্ধক রাখছেন বা বিক্রি করে দিচ্ছেন। ঋণের বোঝা এবং পারিবারিক অশান্তি সহ্য করতে না পেরে অনেক তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষ শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিচ্ছেন বলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত খবর আসছে।

দেশ থেকে পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন জুয়া কেবল ব্যক্তিগত বিপর্যয় ডেকে আনছে না, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও এক বিরাট হুমকি। এই বেটিং সাইটগুলোর অধিকাংশেরই মূল সার্ভার বা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিচালিত হয় দেশের বাইরে থেকে। ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে প্রতিদিন সাধারণ মানুষের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশ এক বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সাময়িক অভিযান চালিয়ে এই অদৃশ্য ডিজিটাল সিন্ডিকেট পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ, কঠোর আইনি নজরদারি এবং সবচেয়ে বড় কথা—পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। আপনার সন্তান বা পরিবারের সদস্য স্মার্টফোনে ঠিক কী করছে, এখনই তার খোঁজ না নিলে আগামীকাল হয়তো অনেক বড় মাশুল গুনতে হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

খুলনায় র‍্যাবের অ্যাকশন: রিয়া বাজারে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ দুই অস্ত্রধারী আটক

হাতের মুঠোয় সর্বনাশা অনলাইন জুয়া: কিশোর থেকে বৃদ্ধ সর্বস্বান্ত, পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা

আপডেট সময় : ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

জনপদের খবর

সাংবাদিক আল আমিন কাজী | বিশেষ প্রতিবেদন

তারিখ: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

ঢাকা: একসময় ‘জুয়া’ বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠত তাসের আড্ডা, কোনো নির্জন ক্লাব কিংবা ঘরের কোণে বসা গোপন আসর। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় সেই চিরাচরিত চিত্র এখন খোলস বদলেছে। অন্ধকার ঘরের জুয়ার আসর এখন উঠে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়, স্মার্টফোনের চকচকে পর্দায়। মোবাইল অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে দেশজুড়ে জাল বিছিয়েছে এক ভয়ংকর অনলাইন বেটিং বা ডিজিটাল জুয়ার সিন্ডিকেট। এই মরণনেশায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার।

সব বয়সী মানুষ এখন ঝুঁকিতে, বাদ যাচ্ছে না স্কুলপড়ুয়ারাও

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অনলাইন জুয়ার ফাঁদ এতটাই সুনিপুণ যে, কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও এখন এই চক্রের প্রধান শিকারে পরিণত হয়েছে। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কিংবা পড়াশোনার খরচের কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারা মেতে উঠছে এই সর্বনাশা খেলায়।

সহজেই রাতারাতি বড়লোক হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এসব জুয়ার অ্যাপের বিজ্ঞাপন ছড়ানো হচ্ছে। সেখানে নামী-দামী তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে বিভ্রান্তিকর প্রমোশনাল কনটেন্ট, যা দেখে খুব সহজেই প্রলুব্ধ হচ্ছে সাধারণ মানুষ।


মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহজ লেনদেন

অনলাইন জুয়া এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো এর সহজ লেনদেন প্রক্রিয়া। দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবা (MFS) যেমন—বিকাশ ও নগদের ব্যক্তিগত এবং মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এই জুয়ার টাকা লেনদেন হচ্ছে। জুয়ার সাইটগুলোতে টাকা জমা দেওয়া (ডিপোজিট) এবং টাকা তোলা (উইথড্র) এত বেশি সহজ করা হয়েছে যে, প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সাধারণ মানুষও কোনো ঝক্কি ছাড়াই এই জুয়ার আসরে যুক্ত হতে পারছে। স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ‘এজেন্ট’, যারা গোপনে এই ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউটের প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে।

কেউ হারাচ্ছেন বসতভিটা, কেউ বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ

এই সর্বনাশা ডিজিটাল জুয়া শুধু মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ই ঘটাচ্ছে না, বরং সামাজিক ও পারিবারিক অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। জুয়ায় হেরে কেউ ব্যবসার মূলধন খোয়াচ্ছেন, কেউ শেষ সম্বল বসতভিটা বন্ধক রাখছেন বা বিক্রি করে দিচ্ছেন। ঋণের বোঝা এবং পারিবারিক অশান্তি সহ্য করতে না পেরে অনেক তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষ শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিচ্ছেন বলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত খবর আসছে।

দেশ থেকে পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন জুয়া কেবল ব্যক্তিগত বিপর্যয় ডেকে আনছে না, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও এক বিরাট হুমকি। এই বেটিং সাইটগুলোর অধিকাংশেরই মূল সার্ভার বা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিচালিত হয় দেশের বাইরে থেকে। ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে প্রতিদিন সাধারণ মানুষের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশ এক বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সাময়িক অভিযান চালিয়ে এই অদৃশ্য ডিজিটাল সিন্ডিকেট পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ, কঠোর আইনি নজরদারি এবং সবচেয়ে বড় কথা—পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। আপনার সন্তান বা পরিবারের সদস্য স্মার্টফোনে ঠিক কী করছে, এখনই তার খোঁজ না নিলে আগামীকাল হয়তো অনেক বড় মাশুল গুনতে হতে পারে।