মো. আল আমিন কাজী, নিজস্ব প্রতিবেদক:
এ দেশে সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য ঠিক কত টাকা? এক কোটি, দুই কোটি, নাকি কয়েক লাখ? না, নরসিংদীর মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনের এক করুণ ঘটনা যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এ দেশে একটি নিরপরাধ জীবনের মূল্য মাত্র ৪০ হাজার টাকা! হ্যাঁ, ২৫ বছর ধরে তিল তিল করে জমানো মাত্র ৪০ হাজার টাকার জন্য এক বাক্প্রতিবন্ধী প্রবীণ নারীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছিনতাইকারীরা।
নিহত ওই নারীর নাম ববি বেগম। তবে স্টেশনের মানুষজন তাঁকে কথা বলতে না পারার কারণে আদর করে ডাকতেন ‘বুবি’ বলে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিবাগত রাত ১টার দিকে মেথিকান্দা স্টেশনের পাশে তাঁর নিজ ঘরে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
২৫ বছর ধরে স্টেশনের আপনজন
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট থেকে পালিয়ে এক কাপড়ে ট্রেনে চড়ে মেথিকান্দা স্টেশনে এসেছিলেন ববি বেগম। এরপর আর কোথাও যাননি। এই স্টেশনটিকেই নিজের ঘরবাড়ি বানিয়ে নিয়েছিলেন। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই প্রতিদিন স্বেচ্ছায় স্টেশনের বাথরুম পরিষ্কার করতেন, ঝাড়ু দিতেন এবং পুরো স্টেশন গুছিয়ে রাখতেন।
তাঁর এই কাজে খুশি হয়ে স্টেশনের দোকানদার ও যাত্রীরা মাঝেমধ্যে দুই-পাঁচ টাকা দিতেন, কেউবা দিতেন খাবার। ববি বেগম মুখে কিছু বলতে না পারলেও একফালি অমায়িক হাসি দিয়ে সেই উপহার গ্রহণ করতেন। এই হাসির কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্টেশনের সবার অত্যন্ত আপনজন।
৪০ হাজার টাকার সেই ‘রহস্যময়’ স্বপ্ন
না খেয়ে, মানুষের দেওয়া এক টাকা-দুই টাকা জমিয়ে দীর্ঘ ২৫ বছরে প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতো একটি তহবিল গড়ে তুলেছিলেন বুবি। স্টেশনের দোকানদাররা মাঝেমধ্যে মজা করে বলতেন, “বুবি, তুমি তো না খেয়ে টাকাগুলো জমাচ্ছো। এই টাকা দিয়ে কী করবে? তোমার তো পরিবারও নেই।” বুবি কোনো উত্তর দিতেন না, শুধু একটি রহস্যময় হাসি দিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা মনের গহীনেই জমা রাখতেন। হয়তো শেষ বয়সে একটু ভালোমন্দের ইচ্ছা ছিল, কিংবা ছিল কোনো অপূর্ণ স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হতে দিল না নরপশুরা।
যেভাবে কেড়ে নেওয়া হলো প্রাণ
গতকাল গভীর রাতে একদল ছিনতাইকারী বুবির সেই ছোট্ট ঘরে হানা দেয়। বুবির একমাত্র সম্বল ওই ৪০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে টাকাগুলো আগলে রাখার চেষ্টা করেন। বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি চিৎকার করতে পারেননি। বাধা দেওয়ায় ছিনতাইকারীরা তাঁর চোখে, ঠোঁটে ও গালে নির্মমভাবে আঘাত করে। পিটিয়ে শরীর রক্তজমাট করে ফেলে রেখে টাকাগুলো নিয়ে চম্পট দেয় তারা। পরে রাত ১টার দিকে একরাশ যন্ত্রণা আর অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বুবি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচার নিয়ে প্রশ্ন
এই হত্যাকাণ্ডের পর মেথিকান্দা স্টেশনের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তবে ঘটনার পর বেশ কিছু সময় পার হয়ে গেলেও এখনো কোনো হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
ক্ষুব্ধ স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, বুবি তো কোনো ভিআইপি, মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্টেশনের একজন অতি সাধারণ বাথরুম পরিষ্কারকারী। তাই হয়তো তাঁর মৃত্যুর পর কোনো বড় প্রতিবাদ বা মানববন্ধন হবে না। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাঁর কি নিরাপদে বাঁচার অধিকার ছিল না? কিছুদিন আগেও কুমিল্লার এক কাস্টমস অফিসারকে ছিনতাইকারীরা একইভাবে হত্যা করেছিল, যার বিচার এখনো মেলেনি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অনেকেই হারাচ্ছেন প্রাণ। মেথিকান্দা স্টেশনের এই অসহায় বোবা নারীর নির্মম হত্যাকাণ্ড যেন দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়ে গেল। বুবির হত্যাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণ।

মোঃ আল আমিন কাজী 


















