আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শতাব্দীর ভয়াবহতম জোড়া ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও থামেনি লাশের মিছিল। চারদিকে শুধু স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর ধ্বংসস্তূপ। সময় যত গড়াচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় আড়াই হাজারে পৌঁছেছে এবং জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।
গত বুধবার (১ জুলাই) দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ হতাহতের সর্বশেষ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৯৫ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ১১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং অন্তত ১৩ হাজার মানুষ তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
৭ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক
ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পরও দেশজুড়ে এক শোকস্তব্ধ ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ বিরাজ করছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। শোকবার্তায় আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “এই অকল্পনীয় মানবিক বিপর্যয়ে আমাদের দেশের আত্মা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।”
ধ্বংসস্তূপে ‘D’ চিহ্ন ও অলৌকিক উদ্ধার
৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার এই জোড়া ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরের লা গুয়ারিয়া শহর। সেখানে উদ্ধারকর্মীরা ধসে পড়া অধিকাংশ ভবনের গায়ে ‘D’ (Dead) চিহ্ন এঁকে দিচ্ছেন, যার অর্থ হলো সেখানে তল্লাশি চালিয়ে জীবিত কাউকে পাওয়া যায়নি। স্পেনের উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়কারী হাভিয়ের রোডস বাস্তবতার কঠিন চিত্র তুলে ধরে বলেন, “যেখানে জীবিত উদ্ধারের আর কোনো সম্ভাবনা বা আশা নেই, সেখানে আমরা আর সময় ব্যয় করছি না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের ৭২ ঘণ্টার বেশি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এত হতাশার মধ্যেও গত মঙ্গলবার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ৬ দিন পর শিশুটির এভাবে বেঁচে ফেরাকে উদ্ধারকর্মীরা একটি ‘অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবেই দেখছেন।
মানবিক সংকট ও লুটপাট
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ভেনেজুয়েলার দুর্বল হয়ে পড়া অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমান উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দেখা দিয়েছে চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। লা গুয়ারিয়ার একটি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত ১৮ বছর বয়সী দানিয়েল আরমাস হতাশার সুরে বলেন, “একটু খাবার পাওয়ার জন্য মানুষকে নিজেদের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে।”
এরই মধ্যে দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে চুরি ও লুটপাটের ঘটনাও বেড়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে সাধারণ মানুষের মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগে চারজন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
মানবিক এই বিপর্যয় মোকাবিলায় আগামী তিন মাসে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে জরুরি খাদ্য সহায়তা দিতে ৫ কোটি ডলার তহবিলের আবেদন জানিয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।
অন্যদিকে, চরম সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এমনিতেই দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল, তার ওপর কম টিকাদানের কারণে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে হাম, ডিপথেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) প্রাথমিক উপগ্রহ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। (তথ্যসূত্র: ফ্রান্স ২৪)

মোঃ আল আমিন কাজী 


















