মো. আল আমিন কাজী, ইসলাম ডেস্ক:
ঈমান একজন মুসলমানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র সনদ। ঈমানহীন মানুষ লক্ষ্যহীন, উদ্ভ্রান্ত ও চরম দুর্ভাগ্যগ্রস্ত। ঈমান যেমন মহামূল্যবান, তেমনি এটি অত্যন্ত সংবেদনশীলও বটে। এটি অর্জন করা যেমন পরম সৌভাগ্যের বিষয়, তেমনি সামান্য অসতর্কতার কারণে ঈমান হারিয়ে দুর্ভাগ্যগ্রস্তদের কাতারে শামিল হয়ে যাওয়াও মোটেও অস্বাভাবিক নয়।
বর্তমান যুগ ফিতনার যুগ। চারদিকে বিভ্রান্তিকর মতবাদ, নৈতিক অবক্ষয়, চরম ভোগবাদ, সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা প্রচারণা এবং হারামকে প্রগতি বা স্বাভাবিক করে তোলার প্রবণতাসহ নানাবিধ ফিতনা দিনদিন বিস্তার লাভ করছে। ফলে এই বৈরী সময়ে নিজের ঈমানের ওপর অবিচল থাকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বহু বছর আগেই উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন, “কেয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে অন্ধকার রাতের খণ্ডের মতো ফিতনা গোটা সমাজে ছেয়ে যাবে। তখন সকালের মুমিন সন্ধ্যায় কাফিরে পরিণত হবে।” (সুনানে তিরমিজি)। আজ চারদিকে নিত্যনতুন ফিতনার যে ঝড় বইছে, তা অবলোকন করলে মনে হয় আমরা যেন কেয়ামতপূর্ব সেই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েই অতিক্রম করছি। তাই এই ফিতনাসংকুল সময়ে ঈমানের ওপর অবিচল থাকতে হলে ঈমান সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন, যেসব কারণে ঈমান দুর্বল বা বিনষ্ট হতে পারে সেসব বিষয় জানা এবং ফিতনা থেকে বেঁচে থাকার উপায় সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ঈমানের ব্যাপারে সর্বদা অত্যন্ত সচেতন ও উদ্বিগ্ন থাকতেন। একবার হযরত হানজালা (রা.) অনুভব করলেন, নবীজি (সা.)-এর সান্নিধ্যে থাকলে তাঁর অন্তর যেভাবে আল্লাহমুখী থাকে; নবীজির কাছ থেকে দূরে গিয়ে স্ত্রী-সন্তান, ধনসম্পত্তি ও দুনিয়াবি ব্যস্ততায় জড়ালে অন্তরের সেই অবস্থা আর থাকে না। তিনি এই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি হযরত আবু বকর (রা.)-কে জানালে তিনিও দ্বিমত না করে বললেন, “আমারও তো একই অবস্থা হয়।” (সহীহ মুসলিম)।
এখান থেকে আমাদের সমসাময়িক মুসলিমদের জন্য বড় শিক্ষণীয় বিষয় হলো, নবীজি (সা.) তখন তাঁদের মাঝে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন এবং আজকের মতো ফিতনার নিত্যনতুন সামাজিক ও প্রযুক্তিগত ঝড় এতটা প্রবল ছিল না। তবু তাঁরা নিজেদের ঈমানের সুরক্ষা নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন ছিলেন! অথচ আজ নানা ধরনের ঈমানবিধ্বংসী ফিতনা আমাদের চারপাশকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরেছে, কিন্তু সে তুলনায় আমাদের মাঝে সচেতনতা, আত্মসমালোচনা ও অনুশোচনার তীব্র অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আজকের পবিত্র জুমার মিম্বর থেকে খতিবগণ বর্তমান এই ফিতনাসংকুল পরিস্থিতিতে প্রত্যেক মুমিনকে নিজের ঈমান সুরক্ষিত রাখার জন্য বিশেষ কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন:
১. সঠিক ও বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন
ফিতনাসংকুল সময়ে ঈমান রক্ষার প্রথম ধাপ হলো সমসাময়িক ফিতনাগুলো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা। বিনোদন, খেলাধুলা কিংবা অপসংস্কৃতির নামে কীভাবে সুকৌশলে ঈমানবিধ্বংসী চিন্তা ও নাস্তিক্যবাদী জীবনদর্শন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা গভীরভাবে বুঝতে হবে। শিক্ষার নামে নাস্তিকতা, ভোগবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার প্রসার, খাদ্যাভ্যাস ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার মাধ্যমে মানুষের রুহানিয়াত বা আত্মিক শক্তি দুর্বল করে দেওয়া এবং প্রগতির নামে অনৈতিক বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক করে তোলার নানাবিধ প্রচেষ্টা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কারণ যে ব্যক্তি ফিতনাকে চিনতে পারে না, তার পক্ষে ফিতনা থেকে আত্মরক্ষা করা অসম্ভব।
২. কঠোরভাবে তাকওয়া অবলম্বন
আল্লাহভীতি বা তাকওয়া হলো মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল। হালাল-হারামের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস না করা, আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেওয়া এবং গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে সর্বদা আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখা মুমিনের প্রধান কর্তব্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এর প্রতিদান ঘোষণা করে বলেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার শক্তি (ফুরকান) দান করবেন, তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।” (সূরা আনফাল, আয়াত: ২৯)
৩. কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা
সমাজে যে ধরনের বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিরই সৃষ্টি হোক না কেন, মুমিনকে প্রথমেই দেখতে হবে এ বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহ কী নির্দেশনা দিচ্ছে। মানুষের মনগড়া মত, সাময়িক আবেগ, সামাজিক চাপ বা প্রচলিত আধুনিক সংস্কৃতিকে নয়; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর চিরায়ত নির্দেশনাকেই জীবনের সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিদায় হজের ভাষণে নবীজি (সা.) স্পষ্ট বলে গেছেন, “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এ দুটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকবে, ততদিন কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। সেই দুটি বিষয় হলো— আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং আমার সুন্নাহ (হাদীস)।” (মুয়াত্তা মালেক)
৪. সার্বক্ষণিক দোয়া ও জিকির
মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো দোয়া। ফিতনার এই করাল গ্রাস থেকে নিজের ও পরিবারের ঈমান রক্ষা করার জন্য আল্লাহর অশেষ সাহায্য ও রহমতের কোনো বিকল্প নেই। তাই সব সময় সঠিক ও সরল পথে অবিচল থাকার জন্য আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে দোয়া করা এবং নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া ও জিকির পাঠ করা এই সময়ে অত্যন্ত জরুরি।
৫. বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী চলা
যেকোনো আধুনিক বিষয় বা বিভ্রান্তিতে প্রলোভিত বা প্রভাবিত হওয়ার আগে বিজ্ঞ, আমানতদার ও তাকওয়াবান আলেমে দ্বীনের কাছে শরণাপন্ন হতে হবে। ইসলামি শরিয়তের আলোকে বিষয়টি জেনে নিয়ে তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। নয়তো ফিতনাসংকুল সময়ে সাধারণ মানুষের আবেগতাড়িত হয়ে বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে।
আল্লাহ তাআলা ফিতনার এই কঠিন যুগে আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন এবং ঈমানের ওপর অবিচল থাকার তাওফীক দিন। আমীন।

মোঃ আল আমিন কাজী 



















