মানব রচিত আইনের সীমাবদ্ধতা বনাম আল-কোরআনের চিরন্তন বিধান: কেন এটিই সর্বকালের সর্বাধুনিক জীবনব্যবস্থা?

জনপদের খবর

ইসলাম ও জীবন পাতা

তারিখ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬ | সময়: সকাল ০৭:৫৮

ঢাকা: মানবসভ্যতার উষালগ্ন থেকে মানুষেরই প্রয়োজনে যুগে যুগে নানা আইন, রাজনৈতিক মতবাদ ও শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষের তৈরি প্রতিটি ব্যবস্থার মধ্যেই কোনো না কোনো সীমাবদ্ধতা, গোষ্ঠীস্বার্থ, পক্ষপাতিত্ব এবং ঘনঘন পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ পেয়েছে। এর মূল কারণ হলো—মানুষের জ্ঞান ও দূরদর্শিতা অত্যন্ত সীমিত।

পক্ষান্তরে, মহান আল্লাহ তাআলার অবতীর্ণ গ্রন্থ পবিত্র আল-কোরআন এমন এক ঐশ্বরিক জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের নিকট সরাসরি তাঁর স্রষ্টার পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে। আর এই কারণেই কোরআনের বিধানে রয়েছে এক অনন্য পূর্ণতা, নিখুঁত ভারসাম্য, পরম ন্যায়বিচার ও সর্বযুগে প্রযোজ্য শ্বাশত সমাধান। ইসলামের এই আইন কেবল প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় কোনো ধর্মীয় আচার নয়; বরং এটি সর্বকালের জন্য সবচেয়ে আধুনিক, বাস্তবমুখী ও মানবকল্যাণমূলক এক চিরন্তন আইনব্যবস্থা।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইসলামকে মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বিন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩)। এই ঐতিহাসিক আয়াতই প্রমাণ করে যে ইসলামের মূল বিধান কোনো যুগেই অসম্পূর্ণ বা অচল নয়; বরং এটি মানবজীবনের এক চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা।

আধুনিক সভ্যতার সংকট ও পবিত্র কোরআনের সর্বজনীন সাংবিধানিক নীতি

আজকের তথাকথিত আধুনিক বিশ্বে মানুষ এখনো প্রকৃত ন্যায়বিচার, মৌলিক মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, পারিবারিক স্থিতি ও সামাজিক শান্তির জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অথচ আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগেই পবিত্র কোরআন এই সমস্ত জটিল বিষয়ের মৌলিক নীতিমালা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে।

কোরআনের আইনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—এটি মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতির (ফিতরাত) সঙ্গে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমান বিশ্ব যখন পরিবারব্যবস্থার চরম সংকট, নৈতিক অবক্ষয় ও তীব্র মানসিক অশান্তিতে বিপর্যস্ত, তখন কোরআন ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনে এক চমৎকার ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়। সূরা আন-নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকটাত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমা লঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।’ তাফসিরবিদদের মতে, এই একটি আয়াতের ভেতরেই ইসলামী সভ্যতার মূল সাংবিধানিক ও মানবিক নীতিগুলো লুকিয়ে রয়েছে, যা বর্তমান যুগের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থারও মূল আকাঙ্ক্ষা।

সুদমুক্ত মানবিক অর্থনীতি: বিশ্বব্যাংকের চোখে প্রবৃদ্ধি

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কোরআনের বিধান অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমান বিশ্বের সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বৈষম্য, ঋণের পাহাড় ও চরম আর্থিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এর বিপরীতে কোরআন সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে সমাজে ন্যায্য বণ্টন ও মানবিক অর্থনীতির রূপরেখা দিয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৫)

কোরআনের এই অর্থনৈতিক আধুনিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে ‘ইসলামী ব্যাংকিং’ ও সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশ্বব্যাংকের (World Bank) দেওয়া তথ্যমতে, গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী ইসলামী অর্থনীতির শিল্প অত্যন্ত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং প্রতিবছর এর গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ থেকে ১২ শতাংশ।

মানবাধিকারের প্রথম ও যুগান্তকারী ঘোষণা

জাতি, বর্ণ, ভাষা কিংবা গোত্রের ভিত্তিতে মানুষের তৈরি শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারকে ইসলাম গোড়াতেই প্রত্যাখ্যান করেছে। সূরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।’

জাতিসংঘের আধুনিক মানবাধিকার সনদের বহু আগেই পবিত্র কোরআন ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে সাম্যের এই চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছিলেন, ‘হে লোক সকল! শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। কোনো আরবির ওপর অনারবির এবং অনারবির ওপর আরবির, কৃষ্ণকায়ের ওপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব আছে তো শুধু তাকওয়ার কারণেই।’ (মুসনাদে আহমাদ)

বাস্তবমুখী সমাধান ও ইজতিহাদের সুযোগ

কোরআনের আইন শুধু আধ্যাত্মিক বা পারলৌকিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে ব্যক্তিগত ইবাদত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনীতি, বিচারব্যবস্থা, যুদ্ধনীতি, নারীর অধিকার, উত্তরাধিকার, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পরিবেশ ও সামাজিক সম্পর্কের মতো জীবনের প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয়ের নিখুঁত দিকনির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি এ কিতাবে কোনো কিছুই অবহেলা করিনি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

মানব রচিত আইনের বারবার পরিবর্তন ও বর্তমান সামাজিক অস্থিরতাই প্রমাণ করে যে মানুষের তৈরি কোনো দর্শন সমাজকে চূড়ান্ত মুক্তি দিতে পারে না। কোরআনের মূলনীতি অপরিবর্তনীয় হলেও যুগের প্রয়োজনে এর সঠিক প্রয়োগের জন্য রয়েছে ‘ইজতিহাদ’ বা যুগোপযোগী বিস্তৃতির অবারিত সুযোগ। আর এ কারণেই ইসলাম চৌদ্দ শত বছর আগের ধর্ম হয়েও আজকের এই অত্যাধুনিক বিশ্বেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং আগামী হাজার বছর পরও সমানভাবে আধুনিক থাকবে। দুনিয়া ও আখেরাতের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে আল-কোরআন ও সুন্নাহর পথকে আঁকড়ে ধরাই মানবজাতির একমাত্র মুক্তির উপায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *