‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’: হজের শোভা ও তালবিয়ার অন্তর্দৃষ্টিতে একত্ববাদের মহাসম্মেলন

জনপদের খবর

ইসলাম ও জীবন পাতা

তারিখ: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬ | সময়: সকাল ০৯:০৭

ঢাকা: পবিত্র ঈদুল আজহা ও হজের পুণ্যময় দিনগুলো সমাগত। বিশ্ব মুসলিমের সবচেয়ে বড় মহাসম্মেলন ‘হজ’ পালনের জন্য প্রতিবছর পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লাখো মানুষ মহান আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। আর হজের তিনটি প্রধান ফরজের মধ্যে অন্যতম হলো ইহরাম বাঁধা। ইহরাম বাঁধার পর থেকেই পুরুষ হজযাত্রীরা উচ্চৈঃস্বরে এবং নারী হজযাত্রীরা মনে মনে এক বিশেষ ধ্বনি উচ্চারণ করে মক্কা-মদিনার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলেন। এই সুমধুর আহ্বানই হলো ‘তালবিয়া’।

তালবিয়া কেবল কয়েকটি মুখস্থ শব্দের সমষ্টি নয়; এর অনন্য গঠনশৈলী, সুগভীর ভাব ও ব্যঞ্জনায় লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ আত্মিক জাগরণী মনোভাব। এই শব্দের মূর্ছনায় হজযাত্রীরা নিজেদের আমিত্ব, বৈষম্য, অহংকার ও সংকীর্ণতা ভুলে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্যের মহাসমুদ্রে বিলীন হয়ে যান। একই স্লোগানে দুনিয়ার রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো সবাই একাকার হয়ে সাদা ইহরামের কাপড়ে সাম্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

পাথর ও বৃক্ষরাজি পাঠ করে তালবিয়া

পবিত্র হাদিস শরিফে তালবিয়া পাঠের এক অলৌকিক ও বিস্ময়কর ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যখন কোনো মুসলিম তালবিয়া পাঠ করে, তখন তার ডানে ও বাঁয়ে থাকা পাথর, বৃক্ষরাজি, মাটি—সবকিছুই তার সঙ্গে তালবিয়া পাঠ করতে থাকে। এভাবে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত (তালবিয়া পাঠকারীদের দ্বারা) পূর্ণ হয়ে যায়।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৮২৮)

হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক আহ্বান

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আদি পিতা আদম (আ.)-এর পর নুহের (আ.) সময়ে মহাপ্লাবনে কাবাঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে মহান আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) পুনরায় তা নির্মাণ করেন। নির্মাণ শেষে আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-কে নির্দেশ দেন, “আর মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দিন। তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে সব ধরনের কৃষকায় উটের পিঠে করে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।” (সুরা: হজ, আয়াত: ২৭)

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, এই নির্দেশ পেয়ে ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে আরজ করেছিলেন, “হে প্রভু! এখানে তো কোনো জনমানব নেই, আমার আওয়াজ কে শুনবে?” জবাবে আল্লাহ বলেছিলেন, “আপনার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা করা, বিশ্বের কোণে কোণে তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।” এরপর ইবরাহিম (আ.) ‘আবু কুবাইস’ পাহাড়ে আরোহণ করে চারদিকে মুখ করে ডাক দিলেন, “হে লোক সকল! তোমাদের পালনকর্তা গৃহনির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের ওপর এই গৃহের হজ ফরজ করেছেন। তোমরা সবাই রবের আদেশ পালন করো।”

আল্লাহ তাআলা অলৌকিকভাবে এই আওয়াজ শুধু তখনকার জীবিত মানুষের কানেই নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আগমনকারী সমস্ত মানুষের রুহের কান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। যার যার ভাগ্যে আল্লাহ হজ লিখে রেখেছেন, তারা প্রত্যেকেই সেদিন রুহের জগতে এই আহ্বানের জবাবে বলেছিলেন—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ (হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির)। আর এই জবাবই হলো বর্তমান তালবিয়ার মূল ভিত্তি।

তালবিয়ার পবিত্র শব্দ ও অর্থ

হজের মূল তালবিয়াটি হলো:

‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়ালমুলক, লা শারিকা লাক।’

অর্থ: “আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির! আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব একমাত্র আপনার। আপনার কোনো শরিক নেই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৪৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই তালবিয়াকে হজের সর্বোত্তম শোভা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “সর্বোত্তম হজ হলো—উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করা এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করা।” (মুসনাদ আবু ইয়ালা)

জাহেলি যুগের বিকৃতি ও শিরক থেকে মুক্তির ঘোষণা

আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার পৌত্তলিকেরাও ইবরাহিমি মিল্লাতের নাম দিয়ে হজ করত। কিন্তু তারা শয়তানের প্ররোচনায় তাওহিদের এই মহান বাণীতে শিরকের মিশ্রণ ঘটিয়েছিল। তারা কাবা তওয়াফকালে বলত, “আপনার কোনো শরিক নেই, তবে এমন এক শরিক আছে যার আপনি মালিক, কিন্তু সে আপনার মালিক নয়।” (তাফসির মালিমুত তানজিল)। ইসলাম এসে তাদের এই শিরকি প্রথাকে সমূলে উপড়ে ফেলে।

কোরআনে বলা হয়েছে, শিরক হলো সবচেয়ে বড় জুলুম এবং এটি আল্লাহর দরবারে একটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। মুশরিকদের জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন (সুরা: মায়েদা, আয়াত: ৭২)। হজের এই তালবিয়ায় ‘লা-শারিকা লাক’ (আপনার কোনো শরিক নেই) শব্দটি দুবার জোর দিয়ে উচ্চারণ করা হয়েছে, যা মানুষের ইবাদত, আনুগত্য, প্রার্থনা ও সামগ্রিক জীবন থেকে সব ধরনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শিরক বর্জনের এক চূড়ান্ত ও প্রকাশ্য ঘোষণা।

নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শিক্ষা

‘লাব্বাইক’ শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো—হে প্রভু, আমি আপনার সার্বিক আনুগত্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। হজযাত্রীরা তাদের ঘরবাড়ি, সন্তান-সন্ততি, ব্যবসা ও বিলাসী পোশাক ছেড়ে কেবল দু’টুকরো সাদা কাপড় গায়ে জড়িয়ে প্রভুর দরবারে হাজির হন। ইহরাম অবস্থায় গাছপালা বা পশুপাখির ক্ষতি করা এবং পারস্পরিক কটু কথা বলাও নিষিদ্ধ থাকে। ফলে এই তালবিয়া মানুষের ভেতর দাসত্বের খাঁটি অঙ্গীকার, প্রভুর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, একত্ববাদের মহান স্বীকৃতি এবং আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতার এক অনন্য মানবিক গুণাবলি তৈরি করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *