গ্যাস সংকটে স্থবির রাজধানী: সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, বাসাবাড়িতে দিনের রান্না রাতে

জনপদের খবর

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

তারিখ: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬ | সময়: বেলা ১১:৩৭

ঢাকা: তেলের পাম্পের ভোগান্তি কাটতে না কাটতেই এবার রাজধানীজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে গ্যাস সংকট। গত দেড় থেকে দুই মাস ধরে চলা এই সংকটে একদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বাসাবাড়িতে দিনের বেলা চুলা না জ্বলায় গৃহিণীদের রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে গভীর রাতে। পরিবহন ও আবাসিক— উভয় খাতেই গ্যাসের এই ভয়াবহ সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়ে দিশেহারা নগরবাসী।

সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সিএনজি স্টেশনগুলোর সামনে গ্যাস নেওয়ার জন্য যানবাহনের লাইন এক কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। লাইনে গ্যাসের চাপ বা প্রেসার এতটাই কম যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চালকরা কাঙ্ক্ষিত গ্যাস পাচ্ছেন না। অনেক স্টেশন দিনের বেলা গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রাখছে।

ঢাকার কুড়িল ভাটারা এলাকার পিন্যাকাল পাওয়ার সিএনজি স্টেশনের ক্যাশিয়ার মো. মান্নান জানান, দিনের বেলা লাইনে গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে তাদের সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে; রাতে চাপ বাড়লে পুনরায় চালু করা হয়। প্রগতি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িচালক আবদুস সাত্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। যে সামান্য পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছি, তাতে দিনে দুই থেকে তিনবার পাম্পে আসতে হচ্ছে।”

একই চিত্র মিরপুর ১২ নম্বরের সিরামিক ওয়ার্কস সিএনজি ফিলিং স্টেশনের। স্টেশনের কর্মকর্তা মো. নাইম বলেন, “দিনে গ্যাসের চাপ ১০০ পিএসআই-এ নেমে যায়, কখনো তা ৯০-এ চলে আসে। এই চাপে গ্যাস দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যে চালক ৬০০ টাকার গ্যাস চান, তাকে আমরা ২০০ টাকার বেশি দিতে পারছি না।”

বাসাবাড়িতে দিনের রান্না হচ্ছে মধ্যরাতে

পরিবহন খাতের পাশাপাশি আবাসিক এলাকাগুলোর চিত্র আরও শোচনীয়। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বনশ্রী, মগবাজার এবং পুরান ঢাকার বিশাল অংশে দিনের বেলা চুলায় গ্যাস থাকছে না। প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বাধ্য হয়ে অনেককে এলপিজি সিলিন্ডার, মাটির চুলা বা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে।

মিরপুর ১১ নম্বরের বাসিন্দা সিদ্দিকা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, “সকালে চুলায় আগুনই জ্বলে না। বাধ্য হয়ে মধ্যরাতে যখন গ্যাসের চাপ একটু বাড়ে, তখন জেগে থেকে পরের সারা দিনের রান্না সেরে রাখতে হয়। গ্যাস সংকটের কারণে এখন বাসায় মেহমান দাওয়াত করাও বন্ধ করে দিয়েছি।” গ্যাসের এই তীব্র অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে অনেকেই এলাকা পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় বাসা বদল করছেন।

চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর জানিয়েছেন, ঢাকার পাশাপাশি গাজীপুরেও গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হলেও লাইনে চাপ না থাকায় গ্রাহকদের গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। বিপুল এই ঘাটতির কারণেই মূলত রাজধানীজুড়ে এই স্থবিরতা ও হাহাকার দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *