
জনপদের খবর
বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা
তারিখ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬ | সময়: সকাল ০৭:৩৮
ঢাকা: দেশে কোমলমতি শিশুদের ওপর বিকৃত যৌন লালসা ও ধর্ষণ-পরবর্তী বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো সাধারণ কোনো অপরাধ নয়। অপরাধবিজ্ঞানী এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অবুঝ শিশুদের ওপর যারা এমন পৈশাচিক নির্যাতন চালায়, তারা মূলত এক বিশেষ ধরণের মানসিক অবস্থা বা ‘সাইকোপ্যাথিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার’-এ আক্রান্ত। এদের মনোবৃত্তি ও অপরাধ করার ধরন অনেকটাই কুখ্যাত ‘সিরিয়াল কিলার’ বা ধারাবাহিক খুনিদের মতো।
সাম্প্রতিক সময়ে মাগুরার আছিয়া ও রাজধানীর পল্লবীর রামিসার মতো শিশুদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই (জানুয়ারি-এপ্রিল) দেশে ৭৫টি শিশু জঘন্য ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৩টি শিশু এবং বিকৃত লালসার শিকার হওয়া ৯টি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
ঠান্ডা মাথায় অপরাধ ও পৈশাচিক আনন্দ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এবং প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানী এই অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, “যে ব্যক্তিরা শিশুদের ওপর এমন নৃশংসতা চালায়, তারা ‘সাইকোপ্যাথিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার’ বা ব্যক্তিত্বের দূষণে আক্রান্ত। এটি কোনো স্বাভাবিক রোগ নয়, বরং এক ধরণের মারাত্মক মানসিক অবস্থা। এরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, নিখুঁত পরিকল্পনা করে জঘন্যতম অপরাধ সম্পন্ন করে, যা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এ ধরনের বীভৎস কাজ করে তারা এক ধরণের পৈশাচিক আনন্দ পায় এবং যত বেশি অপরাধ করে, তাদের এই ইচ্ছা আরও বাড়তে থাকে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “এই ঘাতকেরা খুব সহজে যার ক্ষতি করবে তার সঙ্গে মিশে যায়। বাইরে অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ করায় সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝার উপায় থাকে না যে এদের ভেতরে এমন বিকৃত ও ভয়ঙ্কর উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে।”
বিকৃত রুচির মূলে মাদক, পর্নোগ্রাফি ও বিচারহীনতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগ এই সামাজিক ব্যাধির সামাজিক ও অপরাধতাত্ত্বিক দিকগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যখন একটি সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তখন অপরাধীদের সাহস বেড়ে যায়। বর্তমানে মাদক এবং পর্নোগ্রাফি মানুষের হাতের নাগালে চলে আসায় সমাজে বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে ‘শিশুপর্নো’ বা চাইল্ড পর্নোগ্রাফি মানুষের স্বাভাবিক রুচিকে চরমভাবে বিকৃত করে তুলছে।”
পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “খুনির স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধী চরম বিকৃত রুচির অধিকারী এবং মাদকাসক্ত ছিলেন। লোকটির পূর্বের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঠিক শাস্তি না হওয়ায় সে আরও বড় ও বীভৎস অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে আসা এবং মানুষের একাকীত্বও এদের ভয়ংকর, সহিংস ও বিকৃত আচরণে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে।”
চেনা মানুষই যখন চরম শত্রু: কেন হত্যা করা হয় শিশুদের?
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান জানান, শিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো, অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীরা তাদের অত্যন্ত পরিচিত জন বা প্রতিবেশী। মাগুরার ৮ বছরের আছিয়া তার বোনের শ্বশুরবাড়িতে পরিচিতদের হাতে নির্যাতিত হয়ে মারা যায়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দুর্গম পাহাড়ে শিশুটিকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে প্রতিবেশী বাবু শেখ গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করে, যার পরদিন হাসপাতালে শিশুটি মারা যায়।
অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, “ছোট শিশুরা সাধারণত কোনো নির্যাতনের শিকার হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারকে বলে দেয়। অপরাধীরা যখন শিশুদের ওপর এই বিকৃত নির্যাতন চালায়, তখন তারা চরম ভয়ে থাকে যে শিশুটি সবাইকে সব বলে দেবে এবং তারা ধরা পড়ে যাবে। মূলত নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে এবং আইনের হাত থেকে বাঁচতেই তারা অবুঝ শিশুটিকে নির্মমভাবে হত্যা বা টুকরো টুকরো করে ফেলে। আজ আমাদের শিশুরা ঘরে কিংবা বাইরে—কোথাও নিরাপদ নেই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামাজিক ক্যানসার থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু আইনি শাস্তিই যথেষ্ট নয়। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা বন্ধ করা, মাদকের বিস্তার রোধ, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা এবং একই সাথে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।