জনপদের খবর অনলাইন সংস্করণ | ঢাকা
তারিখ: জুমাবার, ১২ জুন ২০২৬ | সময়: রাত ৭:৩২ মিনিট
ইসলামী চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় প্রতিবেদক: আমাদের চারপাশের চেনা সমাজটায় দিন দিন কেমন যেন যান্ত্রিকতা আর দূরত্বের দেয়াল তৈরি হচ্ছে। মানুষ একই ভবনে কিংবা একই মহল্লায় বছরের পর বছর বসবাস করেও একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। অথচ এই সামাজিক দূরত্ব, ভেদাভেদ আর মনের ভেতরের হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে পারস্পরিক ভালোবাসার সেতু বন্ধন তৈরি করার এক মহিমান্বিত এবং জাদুকরী হাতিয়ার রয়েছে আমাদের ইসলামেই; যার নাম ‘সালাম’। এটি কেবল স্রেফ কোনো আনুষ্ঠানিক সম্ভাষণ বা কুশলবিনিময় নয়, বরং ইসলামের গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত।
আজ পবিত্র জুমার খুতবায় দেশের বিভিন্ন মসজিদের মিম্বর থেকে খতিবগণ ইসলামের এই সুন্দর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক আমলটির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। জুমার মিম্বর থেকে উঠে আসা সালামের সেই গভীর তাৎপর্য, বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আজ আমরা মুখোমুখি হয়েছি এক আত্মিক পর্যালোচনার।
সালামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও আসল শক্তি
সাধারণত পৃথিবীর সব ধর্ম, জাতি, গোষ্ঠী ও সংস্কৃতিতেই বিভিন্ন ধরনের সম্ভাষণ প্রচলিত আছে। কোনো সংস্কৃতিতে কেবল সময়ের বন্দনা করে ‘গুড মর্নিং’ বলা হয়, কোনোটায় আবার নিছক লৌকিক কুশলবিনিময় হয়। কিন্তু ইসলামের ‘সালাম’ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অনন্য। এটি মূলত একটি গভীর অর্থবহ পবিত্র দোয়া। আপনি যখন কাউকে বলছেন ‘আসসালামু আলাইকুম’, তখন আপনি তাকে মূলত এই জোরালো বার্তা দিচ্ছেন যে—আমার পক্ষ থেকে আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ, আল্লাহ আপনাকে শান্তিতে রাখুন এবং আপনার ওপর মহান রবের রহমত বর্ষিত হোক।
একটি বাস্তব পরিস্থিতির কথা কল্পনা করা যাক। বিশেষ প্রয়োজনে আপনি সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনো প্রত্যন্ত জায়গায় গেছেন, যেখানে মানুষ কিংবা পথঘাট কিছুই আপনার চেনা নয়। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আপনি প্রতি মুহূর্তে এক অজানা শঙ্কায় ভুগছেন। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করলেন, সেখানকার যারাই আপনার সামনে আসছেন, তাঁরা সবাই স্মিত হাসিমুখে আপনাকে সালাম দিচ্ছেন। অর্থাৎ আপনার শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করে আল্লাহর কাছে সরাসরি দোয়া করছেন। এমতাবস্থায় আপনার মনে কি আর কোনো ভয় বা শঙ্কা থাকবে? কখনোই থাকবে না। বরং সেই সম্পূর্ণ অচেনা মানুষগুলোকে আপনার মুহূর্তেই অতি আপন মনে হবে। এটাই হলো সালামের আসল শক্তি ও রুহানি সৌন্দর্য। এই বার্তার মাধ্যমে অপরিচিত দুই ব্যক্তির মাঝে যেমন মুহূর্তেই বিশ্বাস ও ভালোবাসা নির্মিত হয়, তেমনি পরিচিতদের মধ্যে সৌহার্দ্য আরও বৃদ্ধি পায়।
সালামের এই অপরিসীম গুরুত্বের কথা ফুটে উঠেছে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণীতে। তিরমিজি শরিফের এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রকৃত ইমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা গড়ে না ওঠা পর্যন্ত তোমরা প্রকৃত ইমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসতে লাগবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালাম প্রচার কর।’
আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতির আড়ালে আভিজাত্য
বর্তমান আধুনিক ও করপোরেট জীবনব্যবস্থার চাকচিক্যে পড়ে আমাদের সমাজের অনেকেই এখন সালাম বিনিময়কে কিছুটা ‘আনস্মার্টনেস’ বা মান্ধাতা আমলের মনে করে থাকেন। তাঁরা পশ্চিমা কায়দায় হাই-হ্যালো বা হ্যান্ডশেক করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু সত্য এটাই যে, ইসলামের এই সালামের চেয়ে বেশি রুচিশীল, গভীর ও আভিজাত্যপূর্ণ সম্ভাষণ আর দ্বিতীয়টি নেই। সালামের ভেতরে যে নিখাদ আন্তরিকতা আর গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ থাকে, তা দুনিয়ার অন্য কোনো ভাষার কোনো শব্দে খুঁজে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব।
সালাম মানুষকে বিনয়ী করে এবং প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী করে তোলে। মানুষ হিসেবে আমাদের মাঝে মাঝেমধ্যেই সাময়িক ঝগড়াবিবাদ কিংবা অহমিকার সৃষ্টি হয়। এই অহম বা ইগো ভেঙে যে ব্যক্তি সবার আগে সালাম দেয়, ইসলামে তাকেই সবচেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। বুখারি শরিফে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন রাখা বৈধ নয়। তাদের দেখা হলে একজন একদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, অন্যজন অন্যদিকে। তবে তাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই উত্তম, যে আগে সালাম দেয়।’ অর্থাৎ সালাম হলো মানুষের ভেতরের অহংকার গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক মোক্ষম হাতিয়ার।
পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সালামের চর্চা
সালাম যে ইসলামের কতটা উত্তম কাজ, তা বুখারির আরেকটি বিখ্যাত হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয়। একবার এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইসলামের কোন কাজটি সবচেয়ে উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘অসহায়কে অন্নদান করা এবং পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সবাইকে সালাম দেওয়া।’ দুর্ভাগ্যবশত, আজকের সমাজে আমরা চেনা মানুষ বা পদস্থ কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কাউকে সালাম দিতে কার্পণ্য করি। অথচ সুন্নাহ হলো চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেওয়া। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এখন সালামের ব্যাপক ও নিবিড় চর্চা প্রয়োজন। আমরা যদি শৈশব থেকেই আমাদের সন্তানদের ঘরের ভেতরে সালামের শিক্ষা দিই, তবে তাদের কোমল হৃদয়ে বিনয়, সৌজন্য ও পরমতসহিষ্ণুতার বীজ রোপিত হবে।
ঘরে প্রবেশের সময় পরিবারের সদস্যদের সালাম দেওয়া, ছোটদের স্নেহভরে সালাম দেওয়া কিংবা সমবয়সীদের মাঝে সালামের অভ্যাস গড়ে তোলা—এই ছোট ছোট আমলগুলোই একটি পরিবার ও সমাজকে শান্তি, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক জান্নাতি পরিমণ্ডলে পরিণত করতে পারে। সালাম হলো সেই চাবি, যা দিয়ে রুদ্ধ হৃদয়ের দুয়ার খুব সহজেই খোলা যায়। এটি আমাদের দুনিয়ার জীবনে যেমন নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও সৌহার্দের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে, তেমনি আখেরাতে বয়ে আনে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অফুরন্ত সওয়াব। তাই আসুন, আমরা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সালামের ব্যাপক চর্চায় সচেষ্ট হই।

মোঃ আল আমিন কাজী 

















