নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওটিতে একটি কক্ষে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। যদিও এমপি গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই গত ১৭ জুন তিনি তাকে বিয়ে করেছেন।
তবে এমপির এই দাবির পরপরই ওই তরুণীর একটি চাকরির জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা পুরো ঘটনাকে নতুন মোড় দিয়েছে। সিভির তথ্যের সঙ্গে এমপির দাবির গরমিল থাকায় এটি কি নিছক দ্বিতীয় বিয়ে, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসহায়ত্বকে পুঁজি করা হয়েছে—তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
দ্বিতীয় বিয়ের দাবি বনাম সিভির তথ্যে ধোঁয়াশা
এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দাবি অনুযায়ী, তরুণীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে ১৭ জুন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই তরুণীর সিভিতে সবুজ কালির কলমে এমপির নিজের স্বাক্ষরে লেখা রয়েছে—‘জোর সুপারিশ করছি’। সিভিতে স্বাক্ষরের তারিখ দেওয়া আছে ২২ জুন ২০২৬।
নেটিজেনদের প্রশ্ন—বিয়ের পাঁচ দিন পর চাকরির সিভিতে কেন ওই তরুণীর বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ করা হয়েছে? স্ত্রীর চাকরির সিভিতে কেন একজন সংসদ সদস্যকে ‘সুপারিশ’ করতে হবে?
‘এটি কি সাধারণ কেলেঙ্কারি নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার?’
সিভির তথ্যে গরমিল এবং পুরো ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা। বুধবার (২২ জুলাই) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এ ঘটনার পেছনের সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের দিকটি তুলে ধরেন।
সিভি অনুযায়ী তরুণীর বয়স মাত্র ১৮ বছর উল্লেখ করে তাসনিম জারা তার পোস্টে লেখেন:
“এসএসসি শেষ হওয়া মাত্রই যেহেতু চাকরি খুঁজছেন, তাই অনুমান করা যায় বাড়িতে অভাব। এই রকম সংসারে একটা চাকরি মানে শুধু চাকরি না। মানে মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের ফিজিক্স টিচারের বেতন, বৃষ্টি এলে যে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে তা সারানো।”
চাকরির সুপারিশের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি আরও লেখেন:
“এ দেশে গরিবের চাকরি হয় কীভাবে? পরীক্ষা দিয়ে, লাইনে দাঁড়িয়ে। আর সবশেষে, কোনো ক্ষমতাবান মানুষের দরজায় গিয়ে সুপারিশ নিয়ে। সিভিতে সই পড়ল। জোর সুপারিশ করা হলো। কিন্তু সুপারিশের দাম হিসেবে মেয়েটিকে কী দিতে হয়েছে? হয়তো কিছুই না। হয়তো সবকিছু। আমরা জানি না।”
সংসদের নীরবতা ভাঙার আহ্বান
এই ঘটনাকে কেবল একটি সাধারণ কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন তাসনিম জারা। চাকরির প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে একটি সংসদীয় তদন্ত কমিটির দাবি জানিয়েছেন তিনি।
জারার মতে, অভিযোগ মিথ্যা হলে এমপি কলঙ্কমুক্ত হবেন। আর সত্য হলে, ‘মহান সংসদ’ নামের মর্যাদাটুকু বাঁচাতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সংসদ চুপ থাকলে ধরে নিতে হবে, এই সংসদ কেবল গরিবকে শোষণ করার জন্যই তৈরি।
সুপারিশ-বাণিজ্যের চিরস্থায়ী রূপ
দেশের প্রচলিত দুর্নীতি ও ‘সুপারিশ’ সংস্কৃতির কড়া সমালোচনা করে তাসনিম জারা তার পোস্টের শেষে বলেন, “সরকার বদলায়, দল বদলায়, সুপারিশের ব্যবস্থাটা বদলায় না। এই একটা জায়গায় সব দল একমত। কেন? যার সই ছাড়া চাকরি হয় না, সেই গরিব মানুষটাকে জিম্মি রাখার জন্যই কি? আজকের গল্পটা দেখিয়ে দিল, এই জিম্মিদশার দাম কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে।”
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় চললেও এখন পর্যন্ত সংসদ বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। দেশবাসী এখন দেখার অপেক্ষায়, এই বিতর্কের জল কতদূর গড়ায়।

মোঃ আল আমিন কাজী 


















