জনপদের খবর অনলাইন সংস্করণ | ঢাকা
তারিখ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬ | সময়: দুপুর ২:১৭ মিনিট
ইসলামিক ডেস্ক: আমাদের গ্রামীণ ও মফস্বল সমাজে আর্থিক প্রয়োজনে একজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিনিময়ে নিজের জমি বন্ধক রাখার নিয়মটি বেশ পুরোনো। ঋণদাতা সাধারণত নিশ্চিত থাকতে চান যে, ঋণগ্রহীতা যদি কোনো কারণে টাকা ফেরত দিতে না পারেন, তবে তিনি বন্ধকি বস্তু থেকে নিজের পাওনা উসুল করে নেবেন। নিরাপদ লেনদেনের স্বার্থে ইসলামও বন্ধক রাখার এই প্রথাকে সরাসরি স্বীকৃতি দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ২৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আর তোমরা যদি প্রবাসে থাকো এবং কোনো লেখক না পাও, তাহলে বন্ধকি বস্তু হস্তগত রাখা উচিত…।’
তবে বর্তমান সমাজে এই নিয়মের আড়ালে একটি বড় ধর্মীয় অনিয়ম জেঁকে বসেছে। তা হলো—টাকা ধার দেওয়ার পর ঋণদাতারা সেই বন্ধকি জমি নিজে চাষাবাদ করেন বা ভোগ করেন। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রচলিত এই পদ্ধতিতে বন্ধকি বস্তু থেকে ঋণদাতার উপকৃত হওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না—তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে।
বন্ধকি জমি ভোগ করা ইসলামের দৃষ্টিতে ‘সুদ’
ইসলামী শরিয়তের অকাট্য বিধান হলো, বন্ধক রাখা বস্তু থেকে বন্ধকগ্রহীতার (যিনি টাকা ধার দিয়েছেন) কোনো ধরনের সুবিধা বা আর্থিক ফায়দা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। এমনকি জমির মূল মালিক যদি স্বেচ্ছায় বা মুখে অনুমতিও দেন, তবুও তা জায়েজ হবে না। কারণ, বন্ধকি বস্তু থেকে যেকোনো ধরনের উপকার গ্রহণ করা সরাসরি সুদের অন্তর্ভুক্ত।
ফিকহে ইসলামীর পরিভাষায় একে বলা হয় ‘রিবাল করদ্ব’ বা ঋণের সুদ। এর সহজ অর্থ হলো—কাউকে ঋণ দিয়ে তার বিনিময়ে মূল টাকার বাইরে কোনো বাড়তি সুবিধা বা ফায়দা লুটে নেওয়া। হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যেসব ঋণে কোনো অতিরিক্ত উপকার ভোগ করা হয়, তা-ই রিবা বা সুদ বলে গণ্য হবে।” (ইলাউস সুনান)।
ফেকাহশাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক’-এর একটি বর্ণনায় এসেছে, এক ব্যক্তি বিখ্যাত তাবেয়ি ইবনে সিরিন (রহ.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘এক লোক আমার কাছে একটি ঘোড়া বন্ধক রেখেছে, অতঃপর আমি (অনুমতি নিয়ে) তাতে আরোহণ করেছি।’ তখন তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘তুমি ওই ঘোড়ার ওপর যে পরিমাণ আরোহণ করেছ, তা সুদ হয়েছে।’
অতএব, ঋণের বিপরীতে জমি বন্ধক রাখার পর ঋণদাতার জন্য সেই জমি থেকে ফসল তোলা বা ভোগ করা মোটেও জায়েজ নেই। (আহকামুল কোরআন, জাসসাস; বাদায়েউস সানায়ে; ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ)।
সমাজে প্রচলিত চতুরতা ও প্রতারণা
আমাদের সমাজে এই হারাম পদ্ধতিটিকে বৈধ করার জন্য একটি চতুর কৌশল বা ভুল প্রথা প্রচলিত আছে। জমি বন্ধক রেখে টাকা দেওয়ার পর বন্ধকগ্রহীতা পুরো জমি ভোগ করেন এবং তা ‘হালাল’ দেখানোর জন্য জমির আসল মালিককে প্রতি বছর সামান্য কিছু টাকা ফেরত দেন, যা ‘জমির ভাড়া’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ইসলামী গবেষকদের মতে, বাস্তবে এটি এক ধরনের প্রতারণা। কেননা যে অর্থ ফেরত দেওয়া হয়, তা সাধারণত ওই অঞ্চলের জমির প্রকৃত ও প্রচলিত ভাড়ার সমপরিমাণ হয় না। নামমাত্র কিছু অর্থ ছুড়ে দিয়ে পুরো জমির ফসল ভোগ করাকে কোনোভাবেই বৈধ ভাড়া বলা যায় না। ঋণের বিনিময়ে সুবিধা নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য বজায় থাকায় তা সুদের ভেতরেই থেকে যায়। সুতরাং এ ধরনের লেনদেন সম্পূর্ণ অবৈধ।
ইসলামসম্মত বৈধ্য বা বিকল্প পদ্ধতি
তবে কোনো জমির মালিকের যদি জরুরি ভিত্তিতে একসঙ্গে অনেক টাকার প্রয়োজন হয়, তবে ইসলাম এর একটি চমৎকার ও বৈধ বিকল্প পথ দেখিয়েছে। এই পন্থায় অন্যের জমি ভোগ করতে চাইলে শুরু থেকেই ‘ঋণ ও বন্ধক’ চুক্তি না করে ‘অগ্রিম ভাড়া বা পত্তন’ চুক্তি করতে হবে।
পদ্ধতিটি হলো: জমির মালিক তাঁর জমির বার্ষিক ভাড়া নির্ধারণ করে একসঙ্গে কয়েক বছরের জন্য জমিটি ভাড়া দিয়ে অগ্রিম টাকা গ্রহণ করতে পারবেন।
- যেমন: কোনো ব্যক্তির এক লাখ টাকার প্রয়োজন এবং তার এক বিঘা জমির বার্ষিক প্রচলিত ভাড়া ১০ হাজার টাকা। তিনি ১০ বছরের জন্য জমিটি ভাড়া দিয়ে একসঙ্গে অগ্রিম এক লাখ টাকা নিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারবেন। এরপর অর্থদাতা প্রতি বছর ওই জমি ভোগ করবেন এবং প্রতি বছরের ভাড়া বাবদ ১০ হাজার টাকা করে ওই এক লাখ টাকা থেকে কমতে থাকবে। ১০ বছর পূর্ণ হলে চুক্তি শেষ হবে। যদি এর আগে টাকা ফেরত দিতে চান, তবে আনুপাতিক হারে অবশিষ্ট টাকা জমিওয়ালা ভাড়াগ্রহীতাকে ফেরত দিয়ে জমি বুঝে নেবেন।
আর কেউ যদি ভুলবশত আগে থেকেই বন্ধকি চুক্তি করে ফেলেন, তবে অর্থদাতাকে জমি ভোগ করা বন্ধ করতে হবে। আর যদি তিনি জমিটি ভোগ করতেই চান, তবে আগের বন্ধকি চুক্তিটি সম্পূর্ণ বাতিল করে নতুন করে বাস্তবসম্মত ও এলাকার প্রচলিত মূল্যের সাথে সংগতি রেখে সঠিক ভাড়ায় নতুন চুক্তি করতে হবে। কোনোভাবেই নামমাত্র ভাড়ার নামে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া যাবে না।

মোঃ আল আমিন কাজী 






















