
জনপদের খবর অনলাইন সংস্করণ | ঢাকা
তারিখ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬ | সময়: দুপুর ১২:৩০ মিনিট
বিশেষ প্রতিবেদক: ঈদ, বিশ্ব ইজতেমা কিংবা বিভিন্ন উৎসবের সময় ট্রেনের ছাদে চড়ে হাজার হাজার মানুষের ভ্রমণের দৃশ্য বাংলাদেশে এক পরিচিত কিন্তু চরম বিপজ্জনক চিত্র। আসন সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে কিংবা অসচেতনতার বশে যাত্রীদের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা যেমন কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ, তেমনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে রেলওয়ের মূল্যবান রোলিং স্টক বা কোচ ও ইঞ্জিন। সদ্য শেষ হওয়া ঈদযাত্রার পরিসংখ্যান ও রেলওয়ের যান্ত্রিক বিভাগের তথ্যে এই উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।
বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সদ্য শেষ হওয়া ঈদযাত্রায় সারা দেশে রেলপথে অন্তত ৩১টি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন যাত্রী। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এসব দুর্ঘটনার একটি বড় অংশই ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শুধু প্রাণহানিই নয়, রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রেনের ছাদে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে রেলের যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়ছে, যা প্রকারান্তরে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং নিয়মিত সেবার মান ব্যাহত করছে।
সংকট বাড়াচ্ছে অকেজো কোচ
বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ইনফরমেশন বুক’-এর তথ্য অনুযায়ী, যাত্রী পরিবহনের জন্য রেলের বহরে মোট ২ হাজার ৬৪২টি কোচ বা বগি রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৫২টি ব্রড গেজ এবং ১ হাজার ৪৯০টি মিটার গেজ লাইনের জন্য। তবে এই কোচগুলোর সবকটি সচল নেই। ব্রড গেজ লাইনের মোট ৫৬১টি যাত্রীবাহী বগির মধ্যে ১৬২টি বর্তমানে অকেজো বা মেরামতের অপেক্ষায় অলস পড়ে রয়েছে। ফলে সচল আছে ৩৯৯টি বগি, যা মোট বগির মাত্র ৭১ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে মিটার গেজ লাইনের ১ হাজার ২৪৩টি বগির মধ্যে ২৪২টি অকেজো থাকলেও ১ হাজার ১টি বগি ব্যবহারের উপযোগী রয়েছে; অর্থাৎ এক্ষেত্রে প্রাপ্যতার হার ৮০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই সীমিত সংখ্যক সচল বগি দিয়েই প্রতিদিন দেশের বিপুল পরিমাণ যাত্রী পরিবহন করতে হয়। ফলে ঈদের মতো উৎসবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ট্রেনের ভেতর ও ছাদে ধারণক্ষমতার দুই থেকে তিন গুণ বেশি যাত্রী আরোহণ করেন।
কমছে গতি, বাড়ছে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, “রেলওয়ের বগিগুলো একটি নির্দিষ্ট ওজন বহনের জন্য নকশা করা হয়। কিন্তু ঈদের সময় ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠায় ট্রেনের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ওজনের কারণে বাধ্য হয়ে চালকদের গতি কমিয়ে ট্রেন চালাতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “অতিরিক্ত চাপের ফলে বগির স্প্রিংগুলো পুরোপুরি বসে যায় এবং বিভিন্ন সেফটি আইটেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার ফলে যে বগি দুই মাস পর মেরামত করার কথা, সেটি ১৫ দিনের মধ্যেই করতে হচ্ছে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ সূচি যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি ব্যয়ও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।”
অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, “ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ শুধু বেআইনি নয়, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। ট্রেন যখন কোনো বাঁক বা মোড় অতিক্রম করে, তখন কেন্দ্রবিমুখী বলের (Centrifugal Force) কারণে ছাদে থাকা যাত্রীরা ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান। এছাড়া অতিরিক্ত ওজনের কারণে বিশেষ করে মিটার গেজ ট্রেনের সাসপেনশন স্প্রিংগুলো পুরোপুরি বসে গিয়ে বডির অন্যান্য যন্ত্রাংশের সঙ্গে ঘর্ষণে জড়ায়। এতে বগির গুরুত্বপূর্ণ পার্টস ভেঙে যায় এবং দ্রুত সেগুলোকে ওয়ার্কশপে পাঠাতে হয়।”
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ বা কড়াকড়ি করে ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য যাত্রী চাহিদা ও ট্রেনের সরবরাহের মধ্যকার বিশাল ব্যবধান কমাতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, “রেলওয়ের বর্তমান সংকটের মূল কারণ হলো চাহিদা ও সরবরাহের বড় অসঙ্গতি। কর্মসংস্থানের কারণে উত্তরাঞ্চলের বিপুল মানুষ ঢাকায় থাকেন এবং ঈদের সময় তারা একসঙ্গে বাড়ি ফেরেন। এই চাপ সামলাতে হলে বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের রুটে অতিরিক্ত ট্রেন, কোচ ও লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংযোজন করে রেলের সামগ্রিক পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।”
রেলওয়েকে নিরাপদ ও লাভজনক করতে হলে ঝুঁকিপূর্ণ ছাদের ভ্রমণ বন্ধের পাশাপাশি দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে কোচের সংখ্যা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোঃ আল আমিন কাজী 



















