পশ্চিমবঙ্গে ‘পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন’ কঠোরভাবে পালনের বিজ্ঞপ্তি, কোরবানির আগে চরম সংকটে প্রান্তিক খামারিরা

জনপদের খবর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তারিখ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

কলকাতা: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজ্য সরকার ক্ষমতায় এসেই দীর্ঘদিনের পুরোনো ‘পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন- ১৯৫০’ কঠোরভাবে পালনের জন্য নতুন এক বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। সরকারের আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের পর আসন্ন পবিত্র কোরবানির ঈদের আগে রাজ্যজুড়ে তীব্র বিপাকে পড়েছেন সাধারণ পশু ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক খামারিরা। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে গবাদি পশু কেনাবেচায় এক অভূতপূর্ব স্থবিরতা নেমে এসেছে।

সারা বছর ধরে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে গবাদি পশু পালনের পর ঈদুল আজহার এই সময়টাতে এসে খামারিরা কিছুটা লাভের মুখ দেখেন। কিন্তু এবারের কড়াকড়ি প্রান্তিক খামারিদের রুটি-রুজিতে বড় ধরনের টান ফেলেছে। বিক্রি না হওয়ায় খামারেই পড়ে রয়েছে শত শত গরু ও মহিষ। ফলে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

খামারেই পড়ে আছে পশু, অগ্রিম রুপি ফেরত চাইছেন ক্রেতারা

হাওড়া জেলার সাঁকরাইল ব্লকের যদুনাথ হাতি মহাশ্মশান সংলগ্ন এলাকায় বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গরু ও মহিষের খামার। সেখানকার খামারিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আইন কার্যকর হওয়ার ব্যাপারে তাঁরা আগে থেকে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলেন না।

খামারিদের বক্তব্য, প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগে সাধারণত সেই সব গরু-মহিষ বিক্রি করা হয়—যেগুলো আর দুধ দেয় না কিংবা প্রজনন ক্ষমতা হারিয়েছে। সেই বিক্রির অর্থ দিয়েই আবার নতুন ও উৎপাদনক্ষম গরু কিনে খামারের ব্যবসা সচল রাখা হয়। কিন্তু নতুন সরকার শপথ নেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই আচমকা এই আইন কঠোর করায় পুরো চেইনটি ভেঙে পড়েছে। অনেকেই আগের চুক্তি অনুযায়ী ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম রুপি নিয়ে ফেলেছিলেন। এখন আইনি জটিলতায় পশু সরবরাহ করতে না পারায় ক্রেতারা সেই রুপি ফেরত চাইছেন, যা খামারিদের আরও বড় সংকটে ফেলেছে।

‘বউয়ের গহনা বন্ধক রেখে খামার করেছি, এখন কী করব?’

সাঁকরাইলের খামারি সোমা সাধুখা নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “সাধারণত সনাতন ধর্মাবলম্বী খামারিরাই সারা বছর ধরে এসব পশুর যত্ন ও কেনাবেচা করে। একটা গরু সর্বোচ্চ আট মাসের মতো ঠিকঠাক দুধ দেয়। যখন দুধ দেওয়া কমে যায়, তখন লোকসান এড়াতে আমরা সেগুলো বিক্রি করে দিই।”

আরেক খামারি বাবলু খান তাঁর ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “বউয়ের গহনা বন্ধক রেখে, ধার-দেনা করে অর্থ জোগাড় করে গবাদি পশু কিনেছিলাম। এখন যদি সেগুলো বিক্রি করতে না পারি, তবে কর্মচারীদের বেতন দেব কীভাবে, আর নিজেই বা বাঁচব কীভাবে? প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এখন নানামুখী চাপ দেওয়া হচ্ছে।”

তরুণ খামারি চন্দন বেহরা জানান, যে গরুগুলো তারা বিক্রি করতে চাইছেন, সেগুলো বসিয়ে খাওয়ানোর মতো সামর্থ্য তাঁদের নেই। কারণ একটি গরুর পেছনে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ রুপি করে খাবার ও চিকিৎসার খরচ গুনতে হচ্ছে। ক্রেতারা অগ্রিম দেওয়া রুপি ফেরত চাওয়ায় তারা এখন দিশেহারা। গত ২০ বছর ধরে এই ব্যবসা করা প্রবীণ খামারি শ্যামল নেগে জানান, তাঁর দীর্ঘ ব্যবসায়ী জীবনে এমন তুঘলকি পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনোই হতে হয়নি।

দুমুখী চাপে খামারিরা, অনড় প্রশাসন

খামার মালিকদের প্রায় সবারই একই অভিযোগ—রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন সংগঠন এবং পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে অগ্রিম রুপি ফেরতের জন্য চাপ দিচ্ছেন ক্রেতারা। দুই দিকের চাপে চরম উদ্বেগে দিন কাটছে তাঁদের।

এ প্রসঙ্গে সাঁকরাইল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সোনালী দাস বলেন, “বিভিন্ন পঞ্চায়েত এলাকা থেকে খামারিদের এই সমস্যার কথা আমাদের জানানো হচ্ছে। আইন তো আইনের পথেই চলবে, সেটা মানতেই হবে। তবে হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতা দুপক্ষই মারাত্মক সংকটে পড়েছেন। আমরা বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাব।”

তবে এ বিষয়ে সাঁকরাইলের সমষ্টি উন্নয়ন কর্মকর্তা (বিডিও) ড. কামরুল মুনির স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “আইনে যা বলা আছে, তার বাইরে প্রশাসনের কিছু করার সুযোগ নেই। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ আইন মেনেই সম্পন্ন করা হবে।” সরকারি এই সিদ্ধান্তের সাথে হাজার হাজার মানুষের জীবিকার বিষয়টি জড়িত থাকায় ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *