
জনপদের খবর সোমবার, ৮ জুন ২০২৬ | সময়: ০১:২১ পিএম
চট্টগ্রাম প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে হামের প্রকোপ বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রোগীর মাত্রাতিরিক্ত চাপে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যা সংকট। হাসপাতালের মাত্র ৫০ শয্যার হাম ওয়ার্ডে বর্তমানে ৮০ জন শিশু চিকিৎসাধীন। বাধ্য হয়ে একটি শয্যায় দুই শিশুকে রেখে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ নগরীর ৯টি ওয়ার্ডকে হামের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১১৬ জন রোগী। এদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু হলেও কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্কও আক্রান্ত হয়েছেন। রোগীর সংখ্যা আকস্মিক বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের হাম ও শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, নিচতলার হাম ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। গরমে ও সংকীর্ণ পরিবেশে গাদাগাদি করে শিশুদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অভিভাবকরা। অন্যদিকে দোতলার ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডেও হাম সন্দেহে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসা চলছে। যাদের শারীরিক অবস্থা তুলনামূলক জটিল, তাদের অক্সিজেন ও স্যালাইন দিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু তাসফিয়া আক্তারের বাবা মো. রুমান তার ভোগান্তির কথা জানিয়ে বলেন, “মেয়ের শরীরে হঠাৎ র্যাশ, জ্বর ও কাশি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করি। এখন সে কিছুটা সুস্থ হলেও এক শয্যায় দুজন শিশুকে রাখতে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে।”
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, “বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ১১৬ জন রোগী ভর্তি আছেন। রোগীর চাপ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় কোনো কোনো শয্যায় একসঙ্গে দুই শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। শিশুদের পাশাপাশি ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী ছয়জন প্রাপ্তবয়স্কও আক্রান্ত হয়েছেন। এমনকি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে আমাদের একজন ইন্টার্ন চিকিৎসকও হামে আক্রান্ত হয়েছেন।”
৯টি এলাকা হটস্পট ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান: স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী দেশে বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি চলছে। চট্টগ্রাম নগরীর যে ৯টি ওয়ার্ডকে হামের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো— জালালাবাদ, চান্দগাঁও, উত্তর পাহাড়তলী, লালখান বাজার, পূর্ব বাকলিয়া, আলকরণ, দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর, দক্ষিণ হালিশহর এবং উত্তর পতেঙ্গা।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৩১৩ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধুমাত্র মহানগরেই আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ২১৫ জন এবং বিভিন্ন উপজেলায় ৯৮ জন। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ জন উপসর্গ নিয়ে এবং তিনজন পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন।
পরীক্ষার কিট সংকট ও দীর্ঘসূত্রিতা: আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও চট্টগ্রামে হাম শনাক্তের কার্যকর পরীক্ষার ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে পাঠাতে হচ্ছে। ফলে পরীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পেতে দুই থেকে তিন দিন সময় লেগে যাচ্ছে, যা চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)-এ হাম পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও কিট সংকট ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অভাবে সেখানে পরীক্ষা শুরু করা যাচ্ছে না। বিআইটিআইডির অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ বলেন, “আমাদের ল্যাবরেটরিতে হাম শনাক্তের পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু হাম-রুবেলা পরীক্ষার কিট না থাকায় আমরা পরীক্ষা চালু করতে পারছি না। কিট ও অনুমোদন পেলে দ্রুততম সময়ে পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব।”
সার্বিক বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। তবে আমরা ইতোমধ্যে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করেছি। শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত হওয়ায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এই পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে আমরা আশাবাদী।”

মোঃ আল আমিন কাজী 



















