আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চরম রূপ নিয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে যন্তরমন্তর এলাকায় আন্দোলনকারীদের জমায়েত দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে পার্লামেন্ট চত্বরেও। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সমর্থনে গতকাল পার্লামেন্ট চত্বরে বিক্ষোভ করেছেন কংগ্রেসসহ বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা। অন্যদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে দিল্লির অন্তত ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।
যন্তরমন্তরে জনসমুদ্র, মোদি-শাহের পদত্যাগ দাবি
দিল্লির প্রাণকেন্দ্র যন্তরমন্তরে গতকাল কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় আন্দোলনকারীরা এলাকা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
উপস্থিত হাজারো সমর্থকের উচ্ছ্বাসের মাঝে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন,
“ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা যন্তরমন্তর ছাড়ব না। যে দেশে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিল, যে দেশে সরকারের সমালোচনা করাকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য করা হতো; আমরা এখন সেই দেশকে জাগিয়ে তুলেছি।”
যন্তরমন্তরে প্রায় এক মাস ধরে অবস্থান করা এক আন্দোলনকারী জানান, “আমরা ভীত। সোমবার আমি পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের মারধর এবং বলপ্রয়োগ করতে দেখেছি। কিন্তু আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ এটিই প্রথমবারের মতো দেশের তরুণদের কথা বলার সুযোগ এনে দিয়েছে।”
পার্লামেন্ট চত্বরে বিরোধীদের বিক্ষোভ ও রাহুল গান্ধীর আটক
তরুণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার পর মোদি সরকারের জন্য এক বড় সংকট তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিরোধী দলগুলো প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করে।
কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি দমনপীড়নের জন্য সরকারকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি তোলেন। এরপর পুলিশ রাহুল গান্ধীকে প্রতিবাদস্থল থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দুই ঘণ্টা আটকে রাখে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন প্রাঙ্গণের পর গতকাল পার্লামেন্ট চত্বরেও বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কালো পোশাক পরে বিক্ষোভ করেন বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিয়ে সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রধান অখিলেশ যাদব বলেন, “ভারতের প্রত্যেক তরুণের ওপর প্রভাব ফেলছে, এমন একটি বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছেন।”
কংগ্রেসের সংসদ সদস্য পবন খেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “প্রথমে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে, তারপর আলোচনা হবে। এতগুলো ছাত্রছাত্রীর ওপর লাঠিচার্জের পর এখন কী আলোচনা হবে?”
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ ও সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান
দিল্লি বিক্ষোভে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, “দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী আইনি বাধ্যবাধকতা, প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতার শর্ত পূরণ করেছে কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।”
তবে গতকাল আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ তুলে দায়ের করা একটি আবেদনের শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
নিরাপত্তার কারণে বন্ধ ১৬টি মেট্রো স্টেশন
বিক্ষোভের জেরে রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল সকালে এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে দিল্লি মেট্রোরেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) জানায়, নিরাপত্তার কারণে লোককল্যাণ মার্গ, রাজীব চক, প্যাটেল চক, রামকৃষ্ণ আশ্রম মার্গ, বারাখাম্বা রোড, সুপ্রিম কোর্ট, সেবাতীর্থ, জনপথ, মান্ডি হাউস, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, আইটিও, দিল্লি গেট, ইন্দ্রপ্রস্থ, খান মার্কেট, জোর বাগ এবং শিবাজি স্টেডিয়াম মেট্রো স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে।
তবে যাত্রীদের সুবিধার্থে রাজীব চক, মান্ডি হাউস এবং সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটে ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা চালু রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মোঃ আল আমিন কাজী 


















