
জনপদের খবর অনলাইন সংস্করণ | ঢাকা
তারিখ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬ | সময়: সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিট
ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা: মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য, প্রচণ্ড দাবদাহে পুরো শরীর ঘেমে একাকার। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করেই পিচঢালা পথ ধরে এগিয়ে চলছেন এক তরুণ। কাঁধে একটি ব্যাগ, মাথায় নিরাপত্তা হেলমেট, হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল আর তাতে গোঁজা বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। বুকভরা স্বপ্ন আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে দুই চাকার বাহনে ভর করে তিনি ছুটে চলছেন দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। এই তরুণ অভিযাত্রীর নাম মোবাশ্বের আলী।
দেশকে জানার, মানুষের গল্প শোনার এবং বাংলার রূপ-প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখার অদম্য ইচ্ছা থেকেই মোবাশ্বের শুরু করেছেন এই ব্যতিক্রমী যাত্রা। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল নিজের জন্মভিটা রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় রাজারামপুর গ্রাম থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। লক্ষ্য—ধীরে ধীরে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে দেখা।
যাত্রার শুরুতে তিনি পঞ্চগড় জেলার পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করেন। এরপর পা রাখেন ঠাকুরগাঁওয়ে। বর্তমানে তার এই ভ্রমণের ৩৯তম দিন চলছে। এরই মধ্যে তিনি দুই জেলার ৮টি উপজেলা ঘুরে ফেলেছেন। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে নতুন নতুন গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন এই তরুণ।
মোবাশ্বের আলী রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার কৃষক রুহুল আমিন ও মর্জিনা বেগম দম্পতির ছোট ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র। সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও তার স্বপ্নটা আকাশছোঁয়া। ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তার। তবে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য আরও বড়—একদিন সাইকেলে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে বিশ্বভ্রমণে বের হওয়া।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল করিম, রাজ্জাক ও আরিফ বলেন, “ছেলেটার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লেগেছে। এখনকার সময়ে অনেক তরুণ যখন মোবাইল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকে, তখন মোবাশ্বের দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে মানুষ ও প্রকৃতিকে জানার চেষ্টা করছে। সে শুধু নিজের শখ পূরণের জন্য ঘুরছে না, পাশাপাশি মানুষকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতন করছে। গাছ লাগানো ও প্রকৃতি সংরক্ষণের যে বার্তা সে দিচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
নিজের এই যাত্রা নিয়ে মোবাশ্বের আলী বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে খুব ধীরে ও কাছ থেকে দেখার। বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলা মূলত এই দেশের বৈচিত্র্যকে উপলব্ধি করার জন্য। শুধু যে সাইকেল যাত্রা করছি তা নয়; দেশের শিক্ষার্থী ও জনসাধারণের কাছে আমার একটা বিশেষ বার্তা আছে—’প্রকৃতি বাঁচলে আমরা বাঁচবো’। আমি সবার মধ্যে একটা সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করছি, যাতে সবাই অন্তত একটি করে গাছ লাগায় এবং পরিবেশ বাঁচায়।”
তিনি জানান, এই দীর্ঘ ভ্রমণের খরচ তিনি মেটাচ্ছেন মূলত নিজের টিউশনি করে জমানো টাকা দিয়ে। পাশাপাশি পরিবারও তাকে কিছুটা সহযোগিতা করছে। তবে পথে বের হওয়ার পর দেশের মানুষের আন্তরিকতা ও ভালোবাসা তাকে মুগ্ধ করেছে। অনেকেই তাকে খাবারের দাওয়াত দেন, কেউ বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেন। মানুষের এই ভালোবাসাই তাকে প্যাডেল চাপার বাড়তি শক্তি জোগায়।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন বলেন, “মোবাশ্বের আলীর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। একজন তরুণ শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে জানার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিচ্ছেন। তবে দীর্ঘ পথ ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিও জরুরি। আমরা তাকে সড়ক আইন মেনে ও সতর্কতার সঙ্গে যাত্রাপথ বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছি। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সফল হোক, এটাই প্রত্যাশা।”

মোঃ আল আমিন কাজী 






















