
জনপদের খবর অনলাইন সংস্করণ | ঢাকা
তারিখ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬ | সময়: বিকেল ৫:২৫ মিনিট
নিজস্ব প্রতিবেদক, আশুলিয়া (ঢাকা): ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ চুরির অপবাদে এক যুবককে নির্মমভাবে মারধর, সালিশি বৈঠকে মোটা অঙ্কের জরিমানা এবং চরম অপমান করার পর তার মৃ*ত্যু*র ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জামগড়া এলাকায় চরম উত্তেজনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত যুবকের নাম আল আমিন (২২)। তিনি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার দেওয়ান টারটিয়া গ্রামের আলম সরকারের ছেলে। আল আমিন আশুলিয়ার জামগড়া উত্তরপাড়া এলাকার শরীফ মার্কেট সংলগ্ন হাশেম কলোনিতে পরিবারের সাথে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।
ঘটনার সূত্রপাত ও নির্মম নির্যাতন
নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার কামাল নামে এক ব্যক্তি নামাজ আদায়ের সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ একটি রিকশা গ্যারেজে রেখে যান। পরবর্তীতে সেগুলো খুঁজে না পেয়ে চুরির সন্দেহে গতকাল মঙ্গলবার সকালে আল আমিনকে তার ভাড়া বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
নিহতের মা আছুমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, তার সামনেই ছেলেকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমার ছেলেকে বাসা থেকে ডেকে নেওয়ার পর আমার চোখের সামনেই মারধর করা হয়। আমি অনেক আকুতি-মিনতি করে বাধা দিলেও কেউ আমার কথা শোনেনি।”
স্বজনদের অভিযোগ, হাশেম কলোনির সামনের মাঠে বিপ্লব মীর, সুমন, আলম ও তানভীরসহ কয়েকজন মিলে আল আমিনকে প্রথম দফায় মারধর করেন। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে পুনরায় ধরে একটি রিকশা গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে বেঁধে রেখে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের কারোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সালিশি বৈঠক ও জরিমানা
নির্যাতনের পর শরীফ মার্কেট এলাকার একটি রিকশা গ্যারেজে স্থানীয় বাড়িওয়ালা সমিতির কার্যালয়ে এক জরুরি সালিশি বৈঠক বসানো হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে চুরির দায়ে আল আমিনের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়। পরে দুপুরের দিকে খবর পেয়ে আল আমিনের বাবা আলম সরকার সেখানে গিয়ে জরিমানা দেওয়ার মুচলেকা দিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করে বাসায় নিয়ে আসেন।
অপমানে ও মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহনন
পরিবারের সদস্যদের দাবি, চুরির মিথ্যা অপবাদ, নির্মম শারীরিক নির্যাতন এবং সালিশের নামে শত শত মানুষের সামনে অপমানিত হয়ে আল আমিন মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে দুপুরের পর তিনি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে গলায় ফাঁস দেন। পরে স্বজনরা টের পেয়ে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে জিরানীর ফজিলাতুন নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের বাবা-মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার ছেলে চোর ছিল না। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সালিশের নামে তাকে যে অপমান ও নির্যাতন করা হয়েছে, সেই মানসিক কষ্ট সইতে না পেরেই সে নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে।” তারা এই ঘটনার সাথে জড়িত মূল হোতাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এদিকে স্থানীয়দের মাঝে দাবি উঠেছে, পরবর্তীতে হারিয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনটি ওই রিকশা গ্যারেজ থেকেই অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা পুলিশ হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে এবং আজ বুধবার ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তারিকুল ইসলাম জানান, “ঘটনার খবর পেয়েই পুলিশ হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে। প্রাথমিক সুরতহালে নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে পুলিশ।”

মোঃ আল আমিন কাজী 






















