ইসলামিক ও বিজ্ঞান ফিচার ডেস্ক:
উপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে মাটি কেবল খনিজ পদার্থ, পলি আর কিছু জৈব উপাদানের শুষ্ক মিশ্রণ। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের কবাট খুলে অনুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখ রাখলে দেখা যায় এক ভিন্ন দৃশ্য—মাটির অভ্যন্তরে ধুকধুক করছে জীবনের এক মহাসমুদ্র। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার মৃত্যুবৎ বা শুষ্ক ভূমিকে নতুন করে জীবন্ত করার যে উল্লেখ করেছেন, আধুনিক মৃত্তিকা বিজ্ঞান ও অণুজীববিদ্যা (Microbiology) আজ সেই সত্যকেই বাস্তব বলে তুলে ধরছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
‘তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, তারপর তার দ্বারা মৃত পৃথিবীকে জীবিত করেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমানদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ২৪)
পৃথিবীর গঠন ও শিলামণ্ডল থেকে মাটির উৎপত্তি
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী কয়েকটি সমকেন্দ্রিক স্তরে বিভক্ত। এর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে অতি ঘন ও ভারী ‘কেন্দ্রভাগ’ (কোর) এবং বাইরের অংশে রয়েছে বায়ুমণ্ডল। তবে মূল শিলামণ্ডল (Lithosphere) হলো সেই কঠিন স্তর, যা মহাদেশ ও মহাসাগরের তলদেশ গঠন করেছে।
পৃথিবীর ব্যাস প্রায় ১৩,০৭০ কিলোমিটার, যার মধ্যে শিলামণ্ডলের গড় পুরুত্ব প্রায় ৩,২০০ কিলোমিটার। আগ্নেয়, পাললিক ও রূপান্তরিত বিভিন্ন শিলা দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক ক্ষয় ও ভাঙনের ফলে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে বিভিন্ন জৈব উপাদানের সাথে মিশে পাতলা একটি আস্তরণ তৈরি করে। এই উপাদানটিকেই আমরা মাটি বলি। মাটির ঠিক নিচেই থাকে উপমাটি (Subsoil), যেখানে ভাঙন ও জৈব পদার্থের পরিমাণ তুলনামূলক কম। এই মাটি ও উপমাটিই পৃথিবীর ওপর প্রাণের বিকাশে মূল আবরণ হিসেবে কাজ করে।
কেন মাটিকে ‘জীবন্ত’ বলা হয়?
কৃষি উৎপাদনের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে বীজকে আশ্রয় দেওয়া, পানি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগানোই মাটির একমাত্র কাজ নয়। মূলত এক চা-চামচ উর্বর মাটিতে যত জীব বাস করে, তা পৃথিবীর মোট মানবসংখ্যার চেয়েও বেশি!
একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে উদ্ভিদের শিকড় থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকৃতির প্রাণী, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল ও প্রোটোজোয়ার মতো অগণিত অণুজীব মিলেমিশে বসবাস করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিজ মাটির মোট ওজনের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে থাকে এই জীবদের যৌথ উপস্থিতি। এসব জীবের জৈব ও রাসায়নিক বিক্রিয়া ছাড়া ভূমির উর্বরতা বজায় থাকা অসম্ভব।
আর এই বিশাল অণুজীব জগতের জন্য প্রাণপ্রবাহ নিশ্চিত করে পানি। এ প্রসঙ্গে কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে:
‘আমি পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত বস্তুকে সৃষ্টি করেছি। তবু কি তারা ঈমান আনবে না?’ (সুরা : আল-আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)
মাটির ভেতরের জটিল ও আশ্চর্যজনক সম্পর্ক
মাটির ভেতরের এই বৈচিত্র্যময় জীবসমাজ বেঁচে থাকার জন্য একে অপরের ওপর নির্ভর করে। তাদের এই আন্তঃসম্পর্ক মূলত দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত:
১. সহযোগিতামূলক সম্পর্ক:
- নিরপেক্ষতা: বহু অণুজীব পাশাপাশি অবস্থান করে নিজ নিজ কাজ শেষ করে, কেউ কারও ক্ষতি বা লাভ করে না।
- সহযোগিতা: উদাহরণস্বরূপ, বায়বীয় অণুজীব পরিবেশ থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে এলাকাকে অক্সিজেনমুক্ত করে। ফলে অবায়বীয় অণুজীবসমূহ (যাদের জন্য অক্সিজেন বিষতুল্য) সহজে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়।
- জটিল যৌগ ভাঙন: কিছু জীব জটিল জৈব পদার্থ বা ক্ষতিকারক বিষাক্ত উপাদান ভেঙে মাটিকে অন্য জীবের বসবাসের জন্য নিরাপদ ও খাদ্য উপযোগী করে তোলে।
২. বিরোধমূলক সম্পর্ক:
- প্রতিযোগিতা ও পরজীবিতা: সীমাবদ্ধ স্থান, অক্সিজেন বা খাদ্যের জন্য মাটির ভেতরের অণুজীবদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। অনেক সময় কোনো কোনো জীব এমন বিশেষ রাসায়নিক নিঃসৃত করে, যা প্রতিপক্ষ জীবের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয় এবং নিজেদের বিস্তার নিশ্চিত করে।
সব মিলিয়ে, মাটির নিচের এই অদৃশ্য জীববৈচিত্র্য ও তাদের জটিল পারস্পরিক বোঝাপড়াই প্রকৃতির জীবনচক্রকে সচল রেখেছে। হাজার বছর আগে কুরআনে ইঙ্গিত দেওয়া সেই ‘জীবন্ত মাটি’ আজ বিজ্ঞানের গবেষণাগারে উন্মোচিত করছে মহান সৃষ্টিকর্তার এক মহাকাব্যিক নিদর্শন।

মোঃ আল আমিন কাজী 


















