স্পোর্টস ডেস্ক:
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহাফাইনাল ম্যাচে স্পেনের কাছে ১-০ গোলের ব্যবধানে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করেছে আর্জেন্টিনা। খেলায় হার-জিত থাকলেও মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনাল মঞ্চে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের পারফরম্যান্স ও আচরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম বিবিসি (BBC)। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফুটবল বিশ্লেষক ফিল ম্যাকনালটির বিশদ বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, অধিনায়ক লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচে সবচেয়ে বড় হতাশার কারণ প্রতিপক্ষ স্পেন ছিল না, বরং আর্জেন্টিনা দলের নিজেদের ভুল কৌশল ও অনভিপ্রেত আচরণই তাদের ডুবিয়েছে। এমনকি প্রতিবেদনের শিরোনামেই কড়া মন্তব্য করে বলা হয়েছে—দলের খেলার ধরন মেসির সাথে যেন ‘প্রতারণা’ করেছে।
মেসিকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল দলের কৌশল
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা তাদের স্বাভাবিক ও নান্দনিক ফুটবল থেকে সরে আসে। ছন্দময় ফুটবল খেলার বদলে দলটি অতিরিক্ত শারীরিক শক্তিপ্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক কৌশলের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। আর দলের এই বিতর্কিত কৌশলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
মাঠে দলের আক্রমণভাগ গুছিয়ে নেওয়ার যে মূল কারিগর, সতীর্থদের অগোছালো খেলার কারণে সেই মেসিকে দীর্ঘ সময় কার্যত মাঠেই বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে দেখা গেছে। বয়স ৩৯ ছুঁলেও চলমান টুর্নামেন্টে মেসি বারবার প্রমাণ করেছেন নিজের ক্লাসিক রূপ। কিন্তু ফাইনালের রাতে সতীর্থদের অতিমাত্রায় ফাউল ও শারীরিক লড়াইকেন্দ্রিক খেলার ধরন তাঁকে নিজের স্বাভাবিক প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগই দেয়নি।
‘ফুটবলের জয় হয়েছে’—বিবিসি
প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ফাইনাল ম্যাচে স্পেনের জয় প্রকৃতপক্ষে ‘ফুটবলের জয়’। পুরো ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে স্প্যানিশ ফুটবলাররা বলের নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাসিং ও পরিকল্পিত আক্রমণের দিক থেকে স্পষ্টভাবে এগিয়ে ছিল। বিপরীতে আর্জেন্টিনা বারবার অপ্রয়োজনীয় ফাউল, শারীরিক অশুভ লড়াই এবং অযাচিত উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়ে নিজেদের মনোযোগ হারায়।
বিবিসি আরও উল্লেখ করে, ম্যাচের শুরুতেই স্পেনের দানি ওলমোর ওপর আর্জেন্টিনার আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার একটি বিপজ্জনক ফাউল করলেও রেফারি তার কঠোর শাস্তি দেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গ্যালারিতে থাকা স্প্যানিশ সমর্থকেরা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান দিতে শুরু করেন। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনা রেফারিংয়ে বাড়তি সুবিধা পেয়ে আসছে—এমন পুরনো অভিযোগও নতুন করে উসকে দেয় এ ঘটনা। প্রথম ৪০ মিনিট পার হওয়ার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা প্রথম হলুদ কার্ড দেখলেও পুরো ম্যাচজুড়ে তাদের বেশ কিছু কঠিন ফাউল বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের বিস্মিত করেছে।
এক পর্যায়ে ফুটবলের শান্ত মেজাজের প্রতীক মেসি নিজেও আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। স্প্যানিশ ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়ার আচরণের বিরুদ্ধে রেফারির কাছে গিয়ে ক্ষোভ ও অভিযোগ প্রকাশ করতে দেখা যায় তাঁকে।
এনজোর লাল কার্ড ও পরিসংখ্যানের করুণ চিত্র
বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয় ম্যাচের টার্নিং পয়েন্টটি। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের একদম শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজের অপ্রয়োজনীয় ফাউল এবং এর জেরে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখে মাঠ ছাড়ার ঘটনা পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একজন কম নিয়ে খেলতে বাধ্য হওয়ায় স্কালোনির শিষ্যদের ওপর চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়, যার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত সময়েই তোরেসের গোলে জয় ছিনিয়ে নেয় স্পেন।
ম্যাচের পরিসংখ্যানও আর্জেন্টিনার বাজে পারফরম্যান্সকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে:
- বিশ্বকাপ ফাইনালের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলমুখে কোনো শটই নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
- বিপরীতে স্প্যানিশরা আর্জেন্টাইন গোলবারে ১২টি শট নেয়।
- প্রথমার্ধে স্পেনের শেষ তৃতীয়াংশে আর্জেন্টিনার সফল পাস ছিল মাত্র ৮টি, অথচ একই সময়ে তারা ফাউল করেছিল ৯টি।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পরও দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে অপ্রীতিকর হাতাহাতি ও উত্তেজনা দেখা যায়। আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের এরিক গার্সিয়া ও গাভির সাথে ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন, যা চরম সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিবিসির মতে, বিশ্ব ফুটবলের এত বড় ও অসাধারণ একটি আসরের সমাপ্তি এমন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হওয়া মোটেই উচিত হয়নি।
তবে সব সমালোচনার মাঝেও ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছে বিবিসি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটিই যদি বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়ে থাকে, তবুও ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের (GOAT) একজন হিসেবেই বিশ্ববাসী তাঁকে চিরকাল স্মরণ রাখবে।
সূত্র: বিবিসি

মোঃ আল আমিন কাজী 



















