ধর্ম ও জীবন ডেস্ক, জনপদের খবর:
মানুষের পার্থিব জীবনে জীবিকা বা রিজিকের সন্ধান এক চিরন্তন বাস্তবতা। তবে ইসলামি জীবনবিধানে কেবল অঢেল অর্থ-সম্পদ উপার্জনই সফলতার মূল চাবিকাঠি নয়; বরং অর্জিত অর্থে বরকত ও আত্মিক তৃপ্তিই হলো আসল শান্তি। পবিত্র কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসে জীবিকায় প্রাচুর্য, বরকত এবং মানসিক স্বস্তি লাভের জন্য সুনির্দিষ্ট দোয়া ও একাধিক ইতিবাচক আমলের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জীবিকা অন্বেষণে প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘তিনিই তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন, কাজেই তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ করো এবং তাঁর রিজিক থেকে আহার করো’ (সুরা মুলক : আয়াত ১৫)।
রিজিক প্রশস্ত হওয়ার বিশেষ মাসনুন দোয়া:
নবী করিম (সা.) জীবিকায় প্রাচুর্য ও বরকত নিশ্চিত করতে সাহাবিদের বিশেষ দোয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত এক হাদিসে উল্লেখ আছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রাতের নির্জনতায় এই দোয়াটি পাঠ করতে শোনেন—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَوَসِّعْ لِي فِي رِزْقِي وَبَارِكْ لِي فِيمَا رَزَقْتَنِي
(উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লি জাম্বি, ওয়া ওয়াসসি লি ফি রিজকি, ওয়া বারিক লি ফিমা রাজাকতানি)
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন, আমার রিজিক প্রশস্ত করে দিন এবং আপনি আমাকে যে জীবিকা দান করেছেন, তাতে বরকত দান করুন’ (সুনানে তিরমিজি : হাদিস ৩৫০০)।
ইসলামি স্কলার ও হাদিস বিশারদদের মতে, দোয়ার পাশাপাশি কোরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত কয়েকটি মৌলিক আমল দৈনন্দিন জীবনে ধারণ করলে রিজিকে অভাবনীয় বরকত নেমে আসে:
১. তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন:
আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখাই হলো জীবিকার পথ সুগম হওয়ার বড় মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ বের করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে ভাবতেও পারেনি’ (সুরা তালাক : আয়াত ২-৩)। প্রখ্যাত মুফাসসির হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, বান্দা যখন আল্লাহর বিধান মেনে পাপ থেকে বেঁচে থাকে, তখন মহান রব তার সমস্ত বিপদ দূর করে কল্পনাতীত উৎস থেকে রিজিকের সংস্থান করে দেন।
২. পাপাচার ও অন্যায় বর্জন:
নেক আমল যেমন জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তেমনি অসৎ কর্ম ও পাপ মানুষের জীবিকা সংকুচিত করে তোলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘কেবল দোয়াই ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে, সৎকর্ম মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করে এবং বান্দা তার কৃত পাপের কারণে জীবিকা থেকে বঞ্চিত হয়’ (মুসনাদে আহমাদ : হাদিস ২২৪১৩)।
৩. হালাল উপার্জনের দৃঢ় প্রত্যয়:
উপার্জনের ক্ষেত্রে সততা ও হালাল পন্থা অবলম্বন করা ফরজ ইবাদতের অংশ। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ফরজ ইবাদতগুলোর পর হালাল জীবিকা অন্বেষণ করা অন্যতম একটি বিশেষ ফরজ’ (শুআবুল ইমান, বায়হাকি)। হারাম পথে কোটি টাকা উপার্জন করলেও আত্মিক সুখ মেলে না, অথচ সৎ পথে অর্জিত অল্প অর্থেও মহান আল্লাহ অপার বরকত দান করেন।
৪. নিয়মিত দান-সদকা করা:
অসহায় মানুষের সাহায্যে ব্যয় করলে সম্পদ কমে না, বরং বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি আমার পথে ব্যয় করো, তোমার জন্য ব্যয় করা হবে (অর্থাৎ সম্পদে প্রাচুর্য আসবে)’ (সহিহ বুখারি : হাদিস ৫৩৫২)।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, আজকের প্রতিযোগিতাপূর্ণ জীবনে অস্থিরতা দূর করতে পার্থিব চেষ্টার পাশাপাশি নবীজির বাতলে দেওয়া দোয়া ও হালাল জীবনের চর্চায় আত্মনিয়োগ করাই প্রকৃত সফলতার পথ।




















