স্পোর্টস ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে আয়োজিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জমকালো আসর শেষ হয়েছে স্পেনের ট্রফি উদযাপনের মধ্য দিয়ে। ছয় সপ্তাহের এই বিশাল ফুটবল যজ্ঞে টিকিটের চড়া দাম, ভিসা সংক্রান্ত নানা জটিলতা, রেফারিং নিয়ে বিতর্ক কিংবা তীব্র গরম নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বহু আলোচনা-সমালোচনা চলেছে। তবে মাঠের সেই তীব্র প্রতিযোগিতা আর বিতর্কের আড়ালে জন্ম নেওয়া কিছু গল্প বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় জয় করে নিয়েছে। ফুটবল যে শুধু একটি খেলা নয়, বরং সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসা, মানবিকতা ও সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করার এক অনন্য মেলবন্ধন—২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠের বাইরের এমন ৭টি স্মরণীয় মুহূর্ত আবারও তা প্রমাণ করল।
১. মায়ের সামনে কেপ ভার্দের ৪০ বছরের গোলরক্ষকের বীরত্ব
বিশ্বকাপের অন্যতম রূপকথার জন্ম দিয়েছিল আফ্রিকান দেশ কেপ ভার্দে। স্পেনের বিপক্ষে শক্তিশালী দলের সামনে ০-০ গোলের বীরত্বপূর্ণ ড্র এনে দেওয়ার কারিগর ছিলেন তাঁদের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা (জোসিমার দিয়াস)। কিন্তু দুঃখের বিষয় ছিল, আর্থিক সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার বিশাল খরচ বহন করতে না পেরে তাঁর মা গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় মার্কিন কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাঁর ভ্রমণের বন্দোবস্ত করা হয়। অবশেষে মিয়ামির গ্যালারিতে বসে ছেলের এমন ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন মা—যা ছিল এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা চিত্র।
২. লামিন ইয়ামালের ছোট্ট ভাই কেইনের মিষ্টি উপস্থিতি
স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকা রাখা ১৭ বছর বয়সী তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল তো আলো ছড়িয়েছেনই, তবে টুর্নামেন্টজুড়ে দর্শকদের উপচে পড়া ভালোবাসা কুড়িয়েছেন তাঁর ৩ বছর বয়সী ছোট ভাই কেইন। প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই মাঠের ভেতর বড় ভাইয়ের দিকে ফুটফুটে কেইনের ছুটে যাওয়া এবং আনন্দদায়ক উপস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। রাতারাতি খুদে তারকা বনে যান কেইন।
৩. কান্নারত উজবেক শিশুকে কলম্বিয়ান সমর্থকদের সান্ত্বনা
কলম্বিয়ার কাছে হেরে উজবেকিস্তান বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর গ্যালারিতে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল এক খুদে উজবেক সমর্থক। চিরশত্রু ভাবাপন্ন গ্যালারির চিত্র মুহূর্তেই বদলে যায়, যখন আশপাশে থাকা কলম্বিয়ান সমর্থকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই শিশুটিকে ঘিরে ধরে একত্রে ‘উজবেকিস্তান, উজবেকিস্তান’ বলে স্লোগান দেওয়া শুরু করেন। ভালোবাসার এই দৃশ্য ভাইরাল হওয়ার পর উজবেকিস্তান জাতীয় ফুটবল দল শিশুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অনুশীলন ক্যাম্পে আমন্ত্রণ জানায় এবং বিশেষ জার্সি ও স্মারক উপহার দিয়ে সম্মানিত করে।
৪. মেক্সিকোর ‘আনঅফিসিয়াল মাসকট’ হাঁস মার্লিন
গ্যালারিতে মেক্সিকোর সবুজ জার্সি গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ানো ‘মার্লিন’ নামের একটি পোষা হাঁস পুরো বিশ্বকাপে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে মেক্সিকো ফুটবল দলের আনঅফিসিয়াল মাসকট হিসেবে পরিচিতি পায় মার্লিন। রাউন্ড অব সিক্সটিনে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে মেক্সিকো বাদ পড়ার পর এক মেক্সিকান সমর্থক গ্যালারির অন্যপ্রান্তে থাকা এক ছোট ইংলিশ ভক্তকে মার্লিনের একটি প্লাশ পুতুল উপহার হিসেবে তুলে দেন—যা গ্যালারির সৌহার্দ্যের বিরল দৃষ্টান্ত।
৫. ক্রিসমাস সোয়েটার পরা ভক্তকে তারকার আসল জার্সি
মেক্সিকোর এক কচি স্কুলশিক্ষার্থী ‘সান্তি’ নিজের দেশের জাতীয় দলের কোনো অফিসিয়াল জার্সি কেনার সামর্থ্য না থাকায় একটি লাল-সবুজ ক্রিসমাস সোয়েটার গায়ে জড়িয়ে গ্যালারিতে হাজির হয়েছিল। শিশুটির সোয়েটার পরে নিবেদিতভাবে উল্লাস করার ভিডিও চোখে পড়ে মেক্সিকান তারকা ফরোয়ার্ড সান্তিয়াগো হিমেনেজের। ভিডিও দেখে আবেগাপ্লুত হিমেনেজ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে শিশুটির নাম ও ঠিকানা খুঁজে বের করেন এবং নিজের একটি অফিশিয়াল জাতীয় দলের জার্সি উপহার হিসেবে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
৬. গ্যালারিজুড়ে বিটলসের ‘হে জুড’ এবং জুড বেলিংহাম
ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জুড বেলিংহামের নান্দনিক ফুটবলে মন্ত্রমুগ্ধ ছিলেন ভক্তরা। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রতিটা ম্যাচে বেলিংহামের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরপরই পুরো গ্যালারি একসঙ্গে গেয়ে উঠতো বিটলস ব্যান্ডের সর্বকালের সেরা গান ‘হে জুড’ (Hey Jude)। বিশেষ করে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হাজার হাজার দর্শকের কণ্ঠে গানের এই মূর্ছনা ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা শৈল্পিক ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
৭. ৭৮ বছরের ডিক অ্যাডভোকাটের সেই আবেগঘন অশ্রু
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় মাত্র দেড় লাখ জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপদেশ কুরাসাও। জার্মানির বিরুদ্ধে নিজেদের প্রথম ম্যাচে কুরাসাওয়ের জাতীয় সঙ্গীত যখন বাজছিল, তখন গ্যালারির দিকে তাকিয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি দলটির ৭৮ বছর বয়সী প্রবীণ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। জার্মানির কাছে বড় ব্যবধানে হারলেও ফুটবলের সবচেয়ে ছোট দেশটি হিসেবে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ঐতিহাসিক গোল করার পর সেই বৃদ্ধ কোচের আনন্দের অশ্রু বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবল অনুরাগীর হৃদয় ছুয়ে যায়।
সূত্র: আল জাজিরা

মোঃ আল আমিন কাজী 


















