ধর্ম ও নৈতিকতা ডেস্ক, জনপদের খবর:
একটি ন্যায়ভিত্তিক, টেকসই ও কল্যাণময় সমাজব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মূলভিত্তি হলো যেখানে প্রতিটি নাগরিকের জীবন, সম্পদ এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা পুরোপুরি নিরাপদ থাকে। তবে সমাজে বিরাজমান সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, জুলুম ও অবৈধভাবে সম্পদ আত্মসাতের মতো গর্হিত কর্মকাণ্ড সেই সামাজিক নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে সমূলে বিনষ্ট করে। ইসলামি আইন ও জীবনবিধানে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিকে মানবতাবিরোধী চরম অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষকদের মতে, সন্ত্রাস হলো এমন ধ্বংসাত্মক তৎপরতা—যার মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শন, বলপ্রয়োগ, রক্তপাত বা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে জননিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে জিম্মি করা হয়। অন্যদিকে ক্ষমতার প্রভাব, ভয়ভীতি বা জোরজুলুমের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ বা সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার নামই চাঁদাবাজি। এই দুটি অপরাধের মৌলিক যোগসূত্র হলো মানুষের ওপর ভীতি সঞ্চার করে তাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া; সন্ত্রাসের মাধ্যমে আঘাত আসে জীবনের নিরাপত্তায় আর চাঁদাবাজির মাধ্যমে ধ্বংস হয় মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ:
মানবজীবনের পবিত্রতা ও জননিরাপত্তার গুরুত্ব অপরিসীম। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতা, আতঙ্ক ও অবিচার তৈরি করা হয়, যা পবিত্র কোরআনের পরিভাষায় ‘ফাসাদ ফিল-আরদ’ বা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নামান্তর। সুরা আল-কাসাসের ৭৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন, ‘তুমি পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।’
অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাতে নিষেধাজ্ঞা:
ব্যবসা-বাণিজ্য, শ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক বা পারস্পরিক স্বেচ্ছাসম্মতি ছাড়া ভীতি প্রদর্শন করে অন্যের উপার্জিত সম্পদ কেড়ে নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৮)। ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য হারাম (মর্যাদাপূর্ণ), যেমন তা হারাম তোমাদের এই দিনে, তোমাদের এই মাসে এবং তোমাদের এই শহরে’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১২১৮)।
জুলুমের কঠিন পরিণতি ও বান্দার হক:
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মূল উৎস হলো জুলুম। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন ঘোর অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৭৪১)। এ ছাড়া জোরপূর্বক বা অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কারীকে হাদিসের পরিভাষায় ‘সাহিবু মাক্স’ হিসেবে অভিহিত করে তার মারাত্মক পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইসলামি আইনজ্ঞরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, চাঁদাবাজি ও সম্পদ হরণের বিষয়টি সরাসরি ‘হককুল ইবাদ’ বা বান্দার অধিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ জাতীয় অপরাধে শুধু আল্লাহর কাছে মুখে ক্ষমা বা তাওবা করলেই মুক্তি মিলবে না; বরং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে এবং তার কাছ থেকে নিঃশর্ত ক্ষমা পেতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, কারও ওপর জুলুম বা অবিচার করা হয়ে থাকলে কিয়ামতের চূড়ান্ত বিচার দিবসের আগেই দুনিয়াতেই যেন তার নিষ্পত্তি করে নিজেকে মুক্ত করে নেওয়া হয় (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯)।
সার্বিকভাবে, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি কোনো সভ্য সমাজের অংশ হতে পারে না। মানবিক মর্যাদা রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে যেমন কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে, তেমনি নাগরিক জীবনেও ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।





















