অর্থনীতি ও বাণিজ্য প্রতিবেদক, জনপদের খবর:
নতুন ক্রয়াদেশ হ্রাস, উৎপাদন শ্লথ হওয়া, কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্যের মজুত সংকোচন এবং আমদানি কমে যাওয়ায় গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতি আরও কমেছে। একই সময়ে নির্মাণ ও সেবা খাতেও মন্দাভাব অব্যাহত রয়েছে। কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকলেও তা সামগ্রিক অর্থনীতির শ্লথগতি কাটাতে পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে আগস্টের তুলনায় সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও দুর্বল হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত সর্বশেষ ‘পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স’ (পিএমআই) প্রতিবেদনে অর্থনীতির এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, আগস্টে যেখানে সার্বিক পিএমআই সূচকের মান ছিল ৪৯.৯ পয়েন্ট, সেপ্টেম্বরে তা ১.৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮.৬ পয়েন্টে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, পিএমআই সূচকের মান ৫০-এর বেশি হলে অর্থনীতির সম্প্রসারণ এবং ৫০-এর নিচে নামলে সংকোচন বোঝায়। ফলে টানা কয়েক মাস ধরেই দেশের অর্থনীতি উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সংকোচন ধারায় রয়েছে।
দেশের কৃষি, শিল্পোৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের শীর্ষ ৪০০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের মতামতের ভিত্তিতে এই সূচক প্রণয়ন করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া উদ্যোক্তারা চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যবসায়িক স্থবিরতার পেছনে মূলত পাঁচটি বড় কারণকে চিহ্নিত করেছেন:
১. দফায় দফায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি,
২. কাঁচামাল ও ব্যবসার পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি,
৩. মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস,
৪. বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মারাত্মক ঘাটতি এবং
৫. ব্যাংকঋণ প্রাপ্তিতে তীব্র কড়াকড়ি ও সীমাবদ্ধতা।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসার আগাম পরিকল্পনা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিতে পারে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সার্বিক সূচক পতনে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে উৎপাদন খাত থেকে। এ খাতে পিএমআই সূচক ২.৬ পয়েন্ট কমে ৪৪.৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে, যা আগস্টে ছিল ৪৭.৪ পয়েন্ট। নির্মাণ খাতের সূচক ৩.৮ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮.৫ পয়েন্টে। টানা দুই মাস ধরে সংকোচনে রয়েছে সেবা খাতও; সেপ্টেম্বরে এর সূচক নেমেছে ৪৯ পয়েন্টে। অন্যদিকে, স্বস্তির বার্তা দিয়ে টানা ১৩ মাস ধরে সম্প্রসারণের ধারা ধরে রেখেছে কৃষি খাত। তবে এ খাতেও সম্প্রসারণের গতি কিছুটা কমে সূচকের মান দাঁড়িয়েছে ৫৫.২ পয়েন্টে (আগস্টে যা ছিল ৫৬.৫)।
প্রতিবেদনের বিষয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ এক বিবৃতিতে বলেন, “সেপ্টেম্বরের পিএমআই সূচক প্রমাণ করে যে উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো তীব্র চাপের মধ্যে নিমজ্জিত। তবে কৃষি খাতের ইতিবাচক ধারা সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছুটা ভারসাম্য ধরে রেখেছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি পুনরুদ্ধারে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি চাহিদা বৃদ্ধি করা, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংক অর্থায়নের বাধা দূর করা এবং পরিচালন ব্যয় কমানো। তবে আশার বিষয় হলো, আসন্ন শীতকালীন বাণিজ্য ও নিশ্চিত ক্রয়াদেশের ওপর ভর করে কিছু প্রতিষ্ঠান সামনের মাসগুলোতে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা করছে।”





















