ধর্ম ও জীবন ডেস্ক, জনপদের খবর:
উন্নত জীবনমান, স্বাচ্ছন্দ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রতিটি মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা। দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন বা আর্থিক স্থবিরতা কেউ প্রত্যাশা করে না। কিন্তু মানবজীবনের বাস্তবতায় অনেক সময়ই ক্ষুধা, আকস্মিক দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন জেঁকে বসে। সংকটকালে অনেকেই চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে নৈতিক স্খলন কিংবা অনৈতিক অন্ধকার জগতের দিকে পা বাড়ান। ইসলামি জীবনবিধানে এ ধরনের কঠিন সংকটময় মুহূর্তে একজন মুমিনের ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত নৈতিকতা, পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সুরক্ষায় সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
ইসলামি অর্থনীতি ও নৈতিক দর্শনের আলোকে সংকট উত্তরণের প্রধান দিকনির্দেশনাসমূহ:
১. ধৈর্য ও বিনম্র নামাজ:
যেকোনো জাগতিক বা আর্থিক বিপদে নামাজের চেয়ে ফলপ্রসূ আত্মিক আশ্রয় আর হতে পারে না। সংকটের মুখে কেবল অস্থির না হয়ে ধৈর্য ও বিনম্র নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আর ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই নামাজ বড় কঠিন, তবে বিনয়ীদের নিকট (কঠিন) নয়’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৪৫)।
২. ইস্তেগফারের মাধ্যমে প্রাচুর্য অন্বেষণ:
আল্লাহর সমীপে কায়মনোবাক্যে ক্ষমাপ্রার্থনা বা ইস্তেগফার মানুষের আর্থিক সংকট দূর করে রিজিকের দরজা উন্মুক্ত করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর নবী হুদ (আ.) স্বীয় জাতিকে সংকটমুক্তির আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আর হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আপন রবের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করো। অতঃপর তাঁর অভিমুখী হয়ে যাও। তিনি তোমাদের ওপর আসমান থেকে মুষলধারে (বৃষ্টি) বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির সঙ্গে আরও শক্তি বাড়িয়ে দেবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৫২)।
৩. বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ:
সঠিক পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ গ্রহণ যেকোনো জাতীয় ও পারিবারিক দুর্ভিক্ষ বা মন্দা মোকাবিলার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। প্রাচীন মিসরের বাদশাহ রাইয়ান ইবনে ওলিদের সাতটি মোটাতাজা ও সাতটি শীর্ণ গাভির জটিল স্বপ্নের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে নবী ইউসুফ (আ.) আসন্ন দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার কার্যকর অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইউসুফ (আ.)-এর সেই দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে—টানা সাত বছর কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সামান্য খাওয়ার অংশ বাদে বাকি শস্য শিষসহ সংরক্ষণ করা এবং পরবর্তী সাত বছরের চরম দুর্ভিক্ষের জন্য বীজ ও খাদ্য সঞ্চয় করে রাখা (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪৭-৪৮)।
৪. সম্পদ সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা:
শরীয়তের বিধান ও হক আদায় করে হালাল পথে সঞ্চয় করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আর্থিক নিরাপত্তা দিয়ে যাওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর অন্তিম শয্যায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁকে দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের অসহায় রেখে মানুষের কাছে হাত পাতার অবস্থায় ছাড়ার চেয়ে স্বাবলম্বী করে রেখে যাওয়া উত্তম’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২৯৫)।
৫. সম্পদের অপচয় রোধ ও সুষম বণ্টন:
ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনে কৃপণতা ও অপচয়—উভয়কেই নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম। পবিত্র কোরআনে ব্যয়ের ভারসাম্যতা তুলে ধরে আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি তোমার হাত নিজ ঘাড়ের সঙ্গে বেঁধে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্তও করে দিয়ো না’ (সুরা : বনি ইসরাইল/ইসরা, আয়াত : ২৯)। একই সঙ্গে সমাজের ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমাতে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে সুরা হাশরের ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সম্পদ যাতে কেবল ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।
৬. মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট রোধ:
সংকটকালে মুনাফালোভী মজুতদারদের অপতৎপরতা রুখতে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ রয়েছে ইসলামে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের অভিশপ্ত আখ্যা দিয়ে হযরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন, ‘আমদানিকারী রিজিকপ্রাপ্ত এবং মজুতকারী অভিশপ্ত’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১৫৩)।
সার্বিকভাবে, ধর্মীয় অনুশাসন, সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই ব্যক্তিগত ও জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।
(মূল ভাবসূত্র: শিক্ষা সচিব ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ)





















