ধর্ম ও জীবন ডেস্ক, জনপদের খবর:
একটি আলোকিত সমাজ বিনির্মাণ, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং জ্ঞান-গবেষণার প্রসারে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকারী কোনো ব্যক্তি নন, বরং তিনি একটি আদর্শ জাতি গঠনের মূল কারিগর। কোমলমতি শিশুদের চরিত্র গঠন, ভবিষ্যতের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী মানসিকতা তৈরি এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকের অবদান অনন্য। নিজেদের অর্জিত প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের আলো দিয়ে তারা শিক্ষার্থীর সুপ্ত বিবেককে জাগ্রত করেন এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ দিয়ে একেকজন ছাত্রকে ভবিষ্যৎ গবেষক ও দেশের কাণ্ডারি হিসেবে গড়ে তোলেন।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি সমাজ ও দর্শনেই শিক্ষকতাকে মর্যাদাপূর্ণ চোখেই দেখা হয়েছে; তবে আসমানি জীবনব্যবস্থা ইসলাম শিক্ষককে আসীন করেছে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহুমুখী অলৌকিক গুণ ও মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের প্রধান পরিচয় হিসেবে শিক্ষকতাকেই তুলে ধরেছেন। প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমাকে মূলত একজন শিক্ষক হিসেবেই প্রেরণ করা হয়েছে’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৯)।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকের সম্মান:
ইসলামের স্বর্ণযুগে মহানবী (সা.), তাঁর সম্মানিত সাহাবি এবং পরবর্তী তাবেইনদের যুগে শিক্ষকের মর্যাদা ছিল আকাশচুম্বী। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.) পাঠদানের পাশাপাশি বিজ্ঞ শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদে নিয়োগ দিতেন। জ্ঞানচর্চায় শিক্ষকের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশে চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর ঐতিহাসিক উক্তিটি আজও চিরভাস্বর। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে যিনি একটিমাত্র অক্ষর শিক্ষা দিয়েছেন, আমি তাঁর কৃতদাস তুল্য; তিনি চাইলে আমাকে মুক্ত করে দিতে পারেন কিংবা বিক্রিও করে দিতে পারেন’ (তালিমুল মুতাআল্লিম)।
আল্লাহর গুণ ও নবীদের মিশন:
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, শিক্ষকতার মূল অনুপ্রেরণা স্বয়ং মহান রব্বুল আলামিন। তিনি মানবজাতির আদি ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাকো; আল্লাহই তোমাদের শিক্ষা দান করেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।’
পাশাপাশি পৃথিবীতে নবী-রাসুল আগমনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে পরিশুদ্ধ করা এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার শিক্ষা দেওয়া। সুরা বাকারার ১৫১ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল পাঠিয়েছি; যিনি তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তোমাদের পরিশুদ্ধ করেন, কিতাব ও গভীর হিকমত শিক্ষা দেন এবং এমন বিষয় শেখান যা তোমরা জানতে না।’ ফলে একজন আদর্শ শিক্ষক মূলত আম্বিয়ায়ে কেরামের সেই পবিত্র দায়িত্বই সমাজে পালন করে থাকেন।
সর্বোত্তম পেশা ও সৃষ্টির দোয়া:
ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষকতাই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব। সহিহ বুখারির ৫০২৭ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে তা শিক্ষা দেয়।’
শিক্ষাদাতার জন্য শুধু মানুষ নয়, সৃষ্টিজগতের প্রতিটি উপাদান মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাকুল, আসমান ও জমিনের যাবতীয় সৃষ্টি—এমনকি মাটির গর্তের পিপীলিকা এবং সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণকামী শিক্ষকের জন্য দোয়া ও মাগফিরাত কামনা করতে থাকে’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৭৫)।
শিক্ষকদের জন্য প্রিয়নবী (সা.) স্বয়ং বিশেষ দোয়া করে বলেছেন, ‘আল্লাহ ওই ব্যক্তির জীবনকে উজ্জ্বল ও তরতাজা রাখুন, যে আমার কোনো বাণী শুনেছে, তা মুখস্থ রেখেছে এবং হুবহু মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৬)।
মৃত্যুর পরও সদকায়ে জারিয়া:
মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পার্থিব সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও শিক্ষকতা এমন এক অনন্য পেশা, যার মাধ্যমে কবরে থেকেও অফুরন্ত নেকি অর্জন করা সম্ভব। সুনানে আবু দাউদের ২৮৮ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করেছেন, ‘মানুষের মৃত্যুর পর তিনটি আমল ছাড়া সব আমলের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়—১. সদকায়ে জারিয়া, ২. এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ বাস্তব জীবনে উপকৃত হয় এবং ৩. এমন নেক সন্তান যে পিতামাতা ও শিক্ষকের জন্য দোয়া করে।’
ইসলামিক স্কলারদের মতে, শিক্ষকদের উচিত পার্থিব অর্জনের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের প্রতি দরদি ও স্নেহশীল অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা, যাতে তারা আদর্শ মানুষ হয়ে দেশ ও দ্বীনের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।




















