কূটনৈতিক ও জাতীয় প্রতিবেদক, জনপদের খবর:
সরকারি সেবা ও সামাজিক সহায়তা পেতে একজন সাধারণ নাগরিককে যেন একাধিক সরকারি দপ্তরের টেবিলে টেবিলে ধরণা দিতে না হয়, সে লক্ষ্যে একটি সমন্বিত, সহজ ও ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার ওপর বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তাঁর মতে, সামাজিক সুরক্ষাকে রাষ্ট্রের কোনো ‘দয়া বা করুণা’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকা ও মানবিক মর্যাদার মৌলিক অধিকার।
রবিবার (৪ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আন্তর্জাতিক থিংক-ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত পঞ্চম ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে’ (Beyond the Safety Net) শীর্ষক এক বিশেষ প্লেনারি সেশনে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবনের দুর্বলতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকির জায়গাগুলো পূর্বাহ্ণেই চিহ্নিত করে সময়মতো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও কার্যকর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।”
জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএসএস)-এর রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এই কৌশল বাস্তবায়নের প্রথম এক দশক পার করেছে। বিগত ১০ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সরকার এখন একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী ভবিষ্যৎ কৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)সহ বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগীদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও গবেষণাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কেবল অনুদান বিতরণের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে হবে বিপন্ন মানুষের মানবিক মর্যাদা সমুন্নত রাখা, দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, পারিবারিক উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করা এবং সমাজের ভেতর ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখা।”
তিনি স্পষ্ট করেন, পরবর্তী ধাপে বাজেটে কত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো—কেবল সেই পরিসংখ্যান দিয়ে প্রকল্পের সাফল্য বিবেচনা করলে চলবে না; বরং সুবিধাভোগীদের জীবনে এর দৃশ্যমান গুণগত প্রভাব কতটা পড়ল এবং তা তাদের স্বাবলম্বী করতে পারল কি না, সেটাই হবে মূল পরিমাপক।
বক্তব্যে বর্তমান সমাজ ও প্রান্তিক পরিবারগুলোর বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এর পাশাপাশি তীব্র নগর দারিদ্র্য, অনানুষ্ঠানিক খাতের অনিরাপদ কর্মসংস্থান, চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, আকস্মিক বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়ের মতো চাপগুলো সাধারণ পরিবারকে নাজুক করে ফেলছে।
এসব জটিল বহুমুখী ঝুঁকি টেকসইভাবে মোকাবিলা করতে একটি সর্বজনীন ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’, শতভাগ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার (ডাটাবেজ) গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ‘নতুন করে গড়ে ওঠা এক বিশ্বে ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আস্থার পথচলা’ শীর্ষক মূল প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশের দুই শতাধিক বিশেষজ্ঞ বক্তা, তিন শতাধিক প্রতিনিধি এবং সহস্রাধিক আমন্ত্রিত অতিথি অংশ নিয়েছেন। শনিবার (৩ অক্টোবর) সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্বনেতা, গবেষক, কূটনীতিক ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণে এই মহা-সম্মেলনের পর্দা নামার কথা রয়েছে।




















