বিনোদন ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জনপদের খবর:
ভক্ত ও অনুরাগীদের অশ্রুসিক্ত ‘নানা অমর রহে’ (নানা অমর থাকুন) স্লোগানের মধ্য দিয়ে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষবিদায় জানানো হলো ভারতীয় চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকারকে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনের ডনজে এলাকায় অবস্থিত অভিনেতার নিজস্ব খামারবাড়িতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর ২০২৬) সকালে গোয়ায় নিজ বাসভবনে আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৭৫ বছর বয়সী এই জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেতা।
ঘনিষ্ঠজনদের বরাতে জানা যায়, মৃত্যুর পর নিজের প্রিয় খামারবাড়িতেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করার অন্তিম ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন নানা পাটেকার। তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ করতেই গোয়া থেকে মরদেহ বিমানে করে পুনেতে এনে ডনজের খামারবাড়িতে শেষবিদায়ের সার্বিক আয়োজন করা হয়। বাবার চিতায় মুখাগ্নি করেন একমাত্র ছেলে মলহার পাটেকার। শেষকৃত্যে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি বলিউডের তারকা ও শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকরা উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বলিউড তারকা জ্যাকি শ্রফ, প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা ও পরিচালক অনিল শর্মাসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়াত অভিনেতাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানানো হয়। রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে সরাসরি পুনের ডনজে গ্রামে গিয়ে শেষকৃত্যে অংশ নেন। অন্যদিকে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ মুম্বাইয়ের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে পুনে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
এনডিটিভি ও হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মৃত্যুর আগের রাত থেকেই নানা পাটেকার তীব্র মাথাব্যথায় ভুগছিলেন। সে সময় গোয়ার বাসভবনে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ভাতিজা প্রসাদ পাটেকার। ভোরের দিকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেলে তাঁকে দ্রুত নিকটস্থ মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে ‘সিপিআর’ দিয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। শেষ পর্যন্ত সকাল ৫টা ২০ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগেও গোয়ার ডোনা পাউলায় ‘সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল’-এর একটি সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে বেশ প্রাণবন্তভাবে বক্তব্য দিতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জাঞ্জিরায় জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বনাথ পাটেকার, যিনি পরবর্তীতে ‘নানা পাটেকার’ নামেই ভারতীয় রূপালি পর্দায় নিজের স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। সংলাপ প্রক্ষেপণের ব্যতিক্রমী ঢং, মুখের ক্ষুরধার অভিব্যক্তি এবং প্রচলিত ধারার বাইরের তীব্র অভিনয়ের জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিষেক হয়। এরপর ‘পরিিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ ও ‘অগ্নিসাক্ষী’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি তিনবার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
মারাত্মক গম্ভীর চরিত্র ছাড়াও কমেডি ধারার চলচ্চিত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল অবিস্মরণীয়। বিশেষ করে ২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্লকবাস্টার ‘ওয়েলকাম’ এবং ২০১৫ সালের ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ চলচ্চিত্রে গ্যাংস্টার ‘উদয় শেঠি’র চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মাঝে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ ছাড়া ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’, ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ এবং মারাঠি ক্ল্যাসিক ‘নটসম্রাট’ তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। চলচ্চিত্র ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত করে।
রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার ও অশ্রুসজল ভালোবাসায় চিরবিদায়ের মধ্য দিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রায় পাঁচ দশকের এক উজ্জ্বল, নির্ভীক ও মহীরুহের মহাপ্রস্থান ঘটল।





















