আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জনপদের খবর:
মাঝআকাশে ককপিটের ভেতরে দুই পাইলটের মধ্যে হাতাহাতি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী ফ্লাইট সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেছে। ইসরায়েলগামী ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের ফিরিয়ে আনতে তেল আবিবের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে সৌদি আরবে বিমান পাঠানোর অনুরোধ জানানো হলেও তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে রিয়াদ কর্তৃপক্ষ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর বরাতে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালে ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ (FZ1073) ফ্লাইটটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। তবে মাঝপথে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ মডেলের বিমানটি দিক পরিবর্তন করে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবুকের প্রিন্স সুলতান বিন আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, তাবুক বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণের পর সেখানে শতাধিক যাত্রী আটকা পড়েন, যাদের সিংহভাগই ছিলেন ইসরায়েলি নাগরিক। যাত্রীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে ইসরায়েল সরকার সামরিক কিংবা বেসামরিক যেকোনো একটি বিমান সৌদি আরবে পাঠানোর সক্রিয় প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে রিয়াদ প্রশাসন তাদের ভূখণ্ডে সরাসরি ইসরায়েলি কোনো ফ্লাইট অবতরণের অনুমতি দেয়নি।
সৌদি আরবের অবস্থান ও বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ:
ইসরায়েলি কোনো বিমানকে নিজ দেশের মাটিতে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে সৌদি আরবের বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ক্লাস্টার২ (Cluster2) জানিয়েছে, তাবুকে আটকা পড়া যাত্রীদের নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দিতে বিকল্প বিমানের ব্যবস্থা করতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ফ্লাইদুবাইয়ের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনাটি সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যকার অমীমাংসিত ও সংবেদনশীল সম্পর্কের বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক আলোচনা থাকলেও কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ২০২২ সালে সৌদি আরব ইসরায়েলগামী আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য নিজেদের আকাশসীমা উন্মুক্ত করলেও, সৌদি মাটিতে সরাসরি ইসরায়েলি কোনো উড়োজাহাজ অবতরণ করা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
মাঝআকাশে ঠিক কী ঘটেছিল?
আন্তর্জাতিক ট্র্যাকিং সংস্থা ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, জর্ডান ও সৌদি আরবের আকাশসীমার কাছাকাছি থাকা অবস্থায় ফ্লাইটটি হঠাৎ মারাত্মক উচ্চতা হারানোর পাশাপাশি সাধারণ জরুরি সতর্কবার্তা (Squawk 7700) এবং পরবর্তীতে উড়োজাহাজে বেআইনি হস্তক্ষেপ বা ছিনতাই সংক্রান্ত সংকেত (Squawk 7500) পাঠায়। প্রাথমিক ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় ইসরায়েল তৎক্ষণাৎ যুদ্ধবিমান আকাশে ওড়ায়। তবে পরবর্তীতে জানা যায়, ঘটনাটি কোনো সন্ত্রাসী হামলা বা ছিনতাই নয়; বরং ককপিটের ভেতরে দুই পাইলটের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছিল।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের বরাতে প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীরা জানান, ককপিটের ভেতর থেকে ধস্তাধস্তি ও তীব্র চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। একপর্যায়ে ককপিটের দরজা খুললে মেঝেতে রক্ত দেখতে পান যাত্রীরা। এ সময় বিমানে থাকা অন্য কয়েকজন যাত্রী ও অফ-ডিউটি ক্রু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেন। তবে মারামারির সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে ফ্লাইদুবাই বা তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। উভয় পাইলটকে চিকিৎসার জন্য তাবুকের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ফ্লাইট চলাকালে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে বিমানটি তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। বিমানের সব যাত্রী নিরাপদে আছেন।
যাত্রীদের আত্মীয়স্বজনের বরাতে জানা গেছে, আটকা পড়া যাত্রীদের ফিরিয়ে আনতে তাবুক বিমানবন্দরে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিকল্প বিমান পাঠানো হয়েছে। অধিকাংশ যাত্রী সেই বিকল্প বিমানে ওঠার প্রস্তুতি নিলেও প্রায় তিনটি পরিবার নিরাপত্তা শঙ্কার অজুহাতে ইসরায়েলি বিমান ছাড়া ওই ফ্লাইটে উঠতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সার্বিক বিষয়ে সৌদি ও আমিরাত কর্তৃপক্ষ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালাচ্ছে।





















