ইসলামিক জীবন ও চিন্তাধারা ডেস্ক:
মানবসমাজে রাষ্ট্র, ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ আমানত। ইসলামি জীবনদর্শনে রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, দল বা বিশেষ গোষ্ঠীর চিরস্থায়ী সম্পদ নয়; বরং ক্ষমতার প্রকৃত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা। তিনি তাঁর অসীম হিকমত অনুযায়ী যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা থেকে অপসারণ করেন।
পবিত্র কোরআনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে— ‘বলুন, হে রাজত্বের মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যাঁর কাছ থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। সব কল্যাণ আপনার হাতেই। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’ (সুরা আলে ইমরান: ২৬)।
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করার কোনো সুযোগ মুমিনের নেই। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ করা, তাঁর বিধানকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া এবং ইনসাফ ও জবাবদিহির নীতি অনুসরণ করা প্রত্যেক শাসকের প্রধান দায়িত্ব।
ক্ষমতা একটি পবিত্র ‘আমানত’
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন— ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে তোমরা আমানত যথাযথভাবে তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে; আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।’
রাষ্ট্রক্ষমতা প্রাপ্তি মূলত একটি বড় পরীক্ষার নাম। এই আমানতের সঠিক ব্যবহার হলো সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা এবং জুলুম-পীড়ন বন্ধ করা। শাসক যদি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল, প্রতিহিংসা বা অন্যায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তবে সে আমানতের গুরুতর খেয়ানত করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহির গুরুত্ব সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন— ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসক জনগণের অভিভাবক; তাকে তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
ইতিহাসের শিক্ষা ও অবাধ্যতার পরিণাম
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্র ও পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব কেবল অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং নৈতিকতা ও ইনসাফই একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। কোরআনে আাদ, সামুদ ও ফেরাউনের মতো ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যাওয়া পরাক্রমশালী জাতিগুলোর ধ্বংসের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে (সুরা আল-ফজর: ৬-১৩)।
সীমালঙ্ঘন, অনাচার ও অবাধ্যতার কারণে এই জাতিগুলো ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেছে। সুরা আর-রাদের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’
ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তায় সুশাসনের মূলভিত্তি
আজকের বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট, সংঘাত ও দুর্নীতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসনের মূল উপাদানগুলো হলো:
- স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: শাসককে সৃষ্টি এবং স্রষ্টা—উভয়ের কাছেই জবাবদিহি করতে হবে।
- ইনসাফ ও আইনের শাসন: ধনী-দরিদ্র ও শক্তিশালী-দুর্বলের ব্যবধান ভুলে সবার জন্য সমান বিচার সুনিশ্চিত করা।
- পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত (শূরা): একচ্ছত্র আধিপত্য এড়িয়ে জনগণের কল্যাণার্থে পরামর্শের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ।
- মানবিক মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা: সামাজিক নিরাপত্তা বিধান এবং পিছিয়ে পড়া ও দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করা।
ক্ষমতার প্রকৃত মর্যাদা তার স্থায়িত্ব বা দম্ভের মধ্যে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জনকল্যাণে তার ন্যায্য ব্যবহারে। কোরআন ও সুন্নাহর আদর্শ অনুসরণ করে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করলেই কেবল একটি সমাজ ও রাষ্ট্র সার্বিক শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থায়ী কল্যাণ লাভ করতে পারে।

মোঃ আল আমিন কাজী 


















