ঢাকা , সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সন্তানের ওপর ভরসা হারিয়ে জীবদ্দশাতেই নিজের কবর খুঁড়ে রাখলেন বৃদ্ধা আয়েশা দীর্ঘ বিরতি ভেঙে রাজের মেগা ধারাবাহিকে ফিরছেন সুমাইয়া শিমু, ছোট পর্দায় বড় ধামাকা স্পেনের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা: মহাফাইনালের মঞ্চে মেসির সামনে একগাদা বিশ্বরেকর্ড ও ইতিহাসের হাতছানি ৫ দিনের সরকারি সফরে তুরস্ক গেলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিজয়নগরে আধুনিক ডাকবাংলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহে অবহিতকরণ সভা গোল্ডেন বুটের রেসে চূড়ায় এমবাপ্পে, ফাইনালে ট্রফি ও বুট জয়ের ডাবল চ্যালেঞ্জে মেসি জামালপুরে ‘স্টপ ড্রাগস, স্টার্ট রানিং’ ম্যারাথন: মাদক ও মোবাইল আসক্তি রুখতে ২৫০ অ্যাথলেটের দৌড় বিশ্বকাপ ফাইনালের মহারণ: চেনা রূপ ও ঐতিহ্যবাহী জার্সিতেই মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন খালি পেটে ব্ল্যাক কফি পানের অভ্যাস কি ডেকে আনছে মানসিক চাপ ও অস্থিরতা? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সব প্রস্তুতি রয়েছে, চকরিয়ায় ত্রাণ বিতরণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহরাস্তিতে গৃহবধূ মিম হ*ত্যা: ডাকাতির নাটক সাজিয়েছিলেন ছোট জা, আদালতে স্বীকারোক্তি বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সরবরাহ সংকট: বাজারে সবজি, মাছ ও মুরগির দামে আগুন মধ্যপ্রাচ্যে চরম যুদ্ধ উত্তেজনা: হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান, মার্কিন হামলার পর পাল্টা আঘাতের হিড়িক ফুটবল বিশ্বকাপ জয়ে নতুন চমক: ট্রফি-মেডেলের পাশাপাশি এবার মিলবে ‘চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’ ১৭ জুলাই ২০২৬: ঢাকাসহ সারা দেশের আজকের নামাজের সময়সূচি

সন্তানের ওপর ভরসা হারিয়ে জীবদ্দশাতেই নিজের কবর খুঁড়ে রাখলেন বৃদ্ধা আয়েশা

ঠাকুরগাঁওয়ে সন্তানদের অবহেলায় জীবদ্দশাতেই নিজের কবর খুঁড়লেন বৃদ্ধা মা | জনপদের খবর

নিজস্ব প্রতিবেদক, ভূল্লী (ঠাকুরগাঁও):

ঘরের ঠিক পাশেই একটি নতুন কবর। প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই কবরটির পাশ দিয়েই হাঁটতে হয় আয়েশা বেগমকে (৭০)। মাঝে মাঝেই তিনি থমকে দাঁড়ান, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন কবরটির দিকে—যেন মৃত্যুর আগে নিজের শেষ ঠিকানাটি নিজেই রোজ পরখ করে নেন। যে সন্তানদের বুক আগলে মানুষ করেছিলেন, শেষ বয়সে এসে তাদের ওপর থেকে সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। আর সেই চরম ক্ষোভ ও অভিমানে জীবিতাবস্থায় নিজের কবর নিজেই প্রস্তুত করে রেখেছেন এই অশীতিপর বৃদ্ধা।

হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে ঠাকুরগাঁওয়ের নবগঠিত ভূল্লী উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামে। আয়েশা বেগম ওই গ্রামের মৃত আয়নাল হকের স্ত্রী।

সম্পত্তি লিখে নিয়ে পর করেছে সন্তানরা

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বামী আয়নাল হকের মৃত্যুর পর থেকেই মূলত আয়েশা বেগমের জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের কালো ছায়া। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর তিন ছেলে কৌশলে মায়ের সব সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার পর থেকেই মায়ের প্রতি চরম উদাসীনতা দেখাতে শুরু করে। কিছুদিন ছেলেদের বাড়িতে ঘুরেফিরে থাকলেও একপর্যায়ে তাদের সংসারে মায়ের জায়গা সংকুলান হয়নি। পুত্রবধূ ও ছেলেদের অবহেলা আর বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে চলে আসতে বাধ্য হন তিনি। পরে স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য ভিটের ওপর একটি জরাজীর্ণ ঘর তুলে একাকী বসবাস শুরু করেন।

বৃদ্ধার আশঙ্কা, ছেলেরা বেঁচে থাকতে যেহেতু তাঁর কোনো খোঁজ নেয়নি, তাই তাঁর মৃত্যুর পর হয়তো দাফন-কাফনের দায়িত্বও তারা নেবে না। এই চরম অনিশ্চয়তা আর ভয় থেকেই জীবদ্দশায় নিজের শেষ আশ্রয়টুকু নিজের হাতেই খুঁড়ে রেখেছেন তিনি।

অন্ধকার ঘরে অনাহারে কাটে দিন

বর্তমানে চরম মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছে আয়েশা বেগমের। তাঁর থাকার ঘরটির অবস্থা অত্যন্ত জরাজীর্ণ। টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে, ফলে বর্ষার দিনে বৃষ্টির পানি সরাসরি ঘরের ভেতরে পড়ে। ঘরে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, যার কারণে প্রতিটা রাত তাঁকে কাটাতে হয় ঘুটঘুটে অন্ধকারে।

নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার কিংবা দুবেলা ভাতেরও কোনো নিশ্চয়তা নেই তাঁর। অনেক সময় প্রতিবেশীদের দেওয়া সামান্য সাহায্য-সহযোগিতা কিংবা না খেয়েই দিন পার করতে হয় তাঁকে।

কান্নাভেজা কণ্ঠে আয়েশা বেগম বলেন, “অনেক কষ্ট করে ছেলেদের বড় করেছি। আজ কেউ একটা বারও এসে জিজ্ঞেস করে না, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ ঘরে পানি পড়ে, অন্ধকারে থাকি। কত দিন যে মাছ-মাংস খাইনি তা মনে নেই। ছেলেরা তো খোঁজ নেয়ই না, উল্টো বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তাই গ্রামবাসীদের বলে রেখেছি, আমি মারা গেলে তারা যেন দাফনটা করে দেয়। সন্তানদের ওপর আমার আর কোনো ভরসা নেই।”

ধনী ছেলেরা নিচ্ছেন না খোঁজ, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

স্থানীয় বাসিন্দা বাপ্পী জানান, আয়েশা বেগমের ছেলেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং তাদের আর্থিক অবস্থাও বেশ ভালো। কিন্তু মায়ের প্রতি তাদের এই অমানবিক আচরণ পুরো গ্রামবাসীকে ক্ষুব্ধ করেছে। এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় ছেলেদের বোঝানোর চেষ্টা করলেও উল্টো তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে পাড়া-প্রতিবেশীদের সামান্য সাহায্যেই কোনোমতে টিকে আছেন এই বৃদ্ধা।

এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য আয়েশা বেগমের ছেলেদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নিজ সন্তানের এমন নির্মমতার শিকার হয়ে আয়েশা বেগমের এই জীবন্ত কবর আগলে রাখার দৃশ্য এখন পুরো এলাকার বাতাস ভারী করে তুলেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সন্তানের ওপর ভরসা হারিয়ে জীবদ্দশাতেই নিজের কবর খুঁড়ে রাখলেন বৃদ্ধা আয়েশা

সন্তানের ওপর ভরসা হারিয়ে জীবদ্দশাতেই নিজের কবর খুঁড়ে রাখলেন বৃদ্ধা আয়েশা

আপডেট সময় : ১৫ ঘন্টা আগে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ভূল্লী (ঠাকুরগাঁও):

ঘরের ঠিক পাশেই একটি নতুন কবর। প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই কবরটির পাশ দিয়েই হাঁটতে হয় আয়েশা বেগমকে (৭০)। মাঝে মাঝেই তিনি থমকে দাঁড়ান, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন কবরটির দিকে—যেন মৃত্যুর আগে নিজের শেষ ঠিকানাটি নিজেই রোজ পরখ করে নেন। যে সন্তানদের বুক আগলে মানুষ করেছিলেন, শেষ বয়সে এসে তাদের ওপর থেকে সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। আর সেই চরম ক্ষোভ ও অভিমানে জীবিতাবস্থায় নিজের কবর নিজেই প্রস্তুত করে রেখেছেন এই অশীতিপর বৃদ্ধা।

হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে ঠাকুরগাঁওয়ের নবগঠিত ভূল্লী উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামে। আয়েশা বেগম ওই গ্রামের মৃত আয়নাল হকের স্ত্রী।

সম্পত্তি লিখে নিয়ে পর করেছে সন্তানরা

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বামী আয়নাল হকের মৃত্যুর পর থেকেই মূলত আয়েশা বেগমের জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের কালো ছায়া। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর তিন ছেলে কৌশলে মায়ের সব সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার পর থেকেই মায়ের প্রতি চরম উদাসীনতা দেখাতে শুরু করে। কিছুদিন ছেলেদের বাড়িতে ঘুরেফিরে থাকলেও একপর্যায়ে তাদের সংসারে মায়ের জায়গা সংকুলান হয়নি। পুত্রবধূ ও ছেলেদের অবহেলা আর বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে চলে আসতে বাধ্য হন তিনি। পরে স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য ভিটের ওপর একটি জরাজীর্ণ ঘর তুলে একাকী বসবাস শুরু করেন।

বৃদ্ধার আশঙ্কা, ছেলেরা বেঁচে থাকতে যেহেতু তাঁর কোনো খোঁজ নেয়নি, তাই তাঁর মৃত্যুর পর হয়তো দাফন-কাফনের দায়িত্বও তারা নেবে না। এই চরম অনিশ্চয়তা আর ভয় থেকেই জীবদ্দশায় নিজের শেষ আশ্রয়টুকু নিজের হাতেই খুঁড়ে রেখেছেন তিনি।

অন্ধকার ঘরে অনাহারে কাটে দিন

বর্তমানে চরম মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছে আয়েশা বেগমের। তাঁর থাকার ঘরটির অবস্থা অত্যন্ত জরাজীর্ণ। টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে, ফলে বর্ষার দিনে বৃষ্টির পানি সরাসরি ঘরের ভেতরে পড়ে। ঘরে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, যার কারণে প্রতিটা রাত তাঁকে কাটাতে হয় ঘুটঘুটে অন্ধকারে।

নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার কিংবা দুবেলা ভাতেরও কোনো নিশ্চয়তা নেই তাঁর। অনেক সময় প্রতিবেশীদের দেওয়া সামান্য সাহায্য-সহযোগিতা কিংবা না খেয়েই দিন পার করতে হয় তাঁকে।

কান্নাভেজা কণ্ঠে আয়েশা বেগম বলেন, “অনেক কষ্ট করে ছেলেদের বড় করেছি। আজ কেউ একটা বারও এসে জিজ্ঞেস করে না, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ ঘরে পানি পড়ে, অন্ধকারে থাকি। কত দিন যে মাছ-মাংস খাইনি তা মনে নেই। ছেলেরা তো খোঁজ নেয়ই না, উল্টো বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তাই গ্রামবাসীদের বলে রেখেছি, আমি মারা গেলে তারা যেন দাফনটা করে দেয়। সন্তানদের ওপর আমার আর কোনো ভরসা নেই।”

ধনী ছেলেরা নিচ্ছেন না খোঁজ, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

স্থানীয় বাসিন্দা বাপ্পী জানান, আয়েশা বেগমের ছেলেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং তাদের আর্থিক অবস্থাও বেশ ভালো। কিন্তু মায়ের প্রতি তাদের এই অমানবিক আচরণ পুরো গ্রামবাসীকে ক্ষুব্ধ করেছে। এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় ছেলেদের বোঝানোর চেষ্টা করলেও উল্টো তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে পাড়া-প্রতিবেশীদের সামান্য সাহায্যেই কোনোমতে টিকে আছেন এই বৃদ্ধা।

এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য আয়েশা বেগমের ছেলেদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নিজ সন্তানের এমন নির্মমতার শিকার হয়ে আয়েশা বেগমের এই জীবন্ত কবর আগলে রাখার দৃশ্য এখন পুরো এলাকার বাতাস ভারী করে তুলেছে।