বিশেষ প্রতিবেদক, জনপদের খবর:
স্বল্পমূল্যে গরু কিনে দেশে এনে বেশি লাভে বিক্রির লোভনীয় হাতছানি কিংবা বিদেশে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির ফাঁদ—এমন প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় মানবপাচারকারী দালাল চক্র নিঃস্ব করে দিচ্ছে একের পর এক পরিবারকে। দালালের চক্করে পড়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে চরম ভোগান্তি, জোরপূর্বক শ্রম এবং বছরের পর বছর বিদেশের কারাগারে বন্দি থাকছেন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহু নিরীহ নাগরিক।
সম্প্রতি ৩৩ মাস ভারতের আসাম রাজ্যের গোয়ালপাড়া কারাগারে কারাভোগ শেষে দেশে ফিরেছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা থানার সোভারকুটি গ্রামের তরুণ মোজাফফর হোসেন (২২)। স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে মাত্র কয়েক হাজার টাকার লোভে ভারত থেকে সস্তায় গরু আনতে গিয়ে আসাম পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ কারাবাস শেষে গত ১৮ সেপ্টেম্বর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিএসএফ তাঁকে সোনাহাট সীমান্তে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে বড় ভাই রুহুল আমিনের জিম্মায় পরিবারের কাছে ফেরেন মোজাফফর।
একই দিন আসামে ২৮ মাস সাজা খেটে দেশে ফিরেছেন ঢাকার যাত্রাবাড়ীর গোলাপবাগ এলাকার বাসিন্দা এক গৃহবধূ (২৫)। গৃহকর্মের ভালো বেতনের চাকরির মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে ভারতে পাচার হয়েছিলেন তিনি। পরে তাঁর দেবর ইমন আহমেদ দীর্ঘ আইনি লড়াই ও পাসপোর্ট করে ভারতে যোগাযোগ করে প্রায় ৩ লাখ টাকা ব্যয় করে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। এ ছাড়া একই সময়ে কচাকাটা থানার আবদুল জলিলসহ আরও অনেকে একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে কারাভোগ শেষে দেশে ফেরেন। অভিযোগ রয়েছে, আসামের বিভিন্ন কারাগারে এখনও বহু বাংলাদেশি বন্দি অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুরসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সুবিধাবঞ্চিত ও বেকার তরুণ-তরুণীদের নিয়মিত টার্গেট করে আসছে সুসংগঠিত মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট। সীমান্ত পার করার পর পুরুষদের ইটভাটা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত করা হয়, আর নারীদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ সামাজিক শোষণ। অন্যদিকে, এই একই সীমান্ত রুট ব্যবহার করে এক শ্রেণির অপরাধী চক্র পাচারের বিনিময়ে দেশে ঢোকাচ্ছে ফেনসিডিল, এস্কাফ, গাঁজা ও ইয়াবার মতো সর্বনাশা মাদক। রংপুর বিভাগের শতাধিক স্পর্শকাতর সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এসব মাদক প্রবেশ করায় কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সীমান্তবর্তী গোতামারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুনাব্বিরুল ইসলাম মনা বলেন, “দালালদের প্রলোভনে পড়ে এক সময় সীমান্ত দিয়ে বহু মানুষ ভালো কাজের আশায় যেতো এবং সেখানে আটক হয়ে জেল খাটতো। এখন সচেতনতা বাড়ায় এ প্রবণতা কিছুটা কমলেও চক্রটি এখনও গোপনে সক্রিয় রয়েছে।”
সীমান্ত পরিস্থিতির বিষয়ে বিজিবি রংপুর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল রুবায়েত জানান, প্রতি বছরই বিভিন্ন প্রলোভনে নারী, শিশু ও পুরুষদের সীমান্ত পার করার অপচেষ্টা চালানো হয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা ও পতাকা বৈঠকের মাধ্যমেই কেবল ওপারে কারাভোগকারীদের সঠিক তথ্য ও তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া গতি পায়।
এদিকে মাদক ও সীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তি জানান, সীমান্তঘেঁষা মাদক চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। মাদক কারবারি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত অপরাধী কাউকেই কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।





















