ধর্ম ও জীবন ডেস্ক, জনপদের খবর:
মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও অমূল্য সম্পদ হলো ইমান বা খাঁটি বিশ্বাস। ইসলামি জীবনবিধানে এই ইমানের বহু শাখা-প্রশাখা ও স্তর রয়েছে, যার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো আত্মমর্যাদাবোধ ও লজ্জাশীলতা। ইসলামি পণ্ডিত ও হাদিস বিশারদদের মতে, লজ্জা কেবল সাধারণ কোনো মানবিক গুণ নয়; বরং এটি ইমানের প্রাণশক্তি। যার মধ্যে লজ্জা রয়েছে, তার মধ্যেই প্রকৃত ইমানের অস্তিত্ব বিদ্যমান।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ইমানের ষাটেরও অধিক (কোনো বর্ণনায় সত্তরের অধিক) শাখা রয়েছে। আর লজ্জা হচ্ছে ইমানের একটি অন্যতম শাখা’ (সহিহ বুখারি : হাদিস ৯; মুসলিম : হাদিস ৩৫)। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) এক আনসারি সাহাবির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন তিনি তাঁর ভাইকে অতিরিক্ত লজ্জা ত্যাগের পরামর্শ দিচ্ছেন। তখন বিশ্বনবী (সা.) বললেন, ‘ওকে ওর মতো থাকতে দাও; কেননা লজ্জা হলো ইমানের অঙ্গ’ (সহিহ বুখারি : হাদিস ২৪)।
উত্তম আমল ও ইমানের স্তরসমূহ:
ইমানের একাধিক স্তরের গুরুত্ব তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে সাহাবিদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। একবার মহানবী (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।’ এরপরের স্তর হিসেবে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সর্বাত্মক সংগ্রাম এবং পরবর্তীতে কবুল হজের কথা উল্লেখ করেন (সহিহ বুখারি : হাদিস ২৬)।
হাদিসে জিবরাইল: ইমান, ইসলাম ও ইহসানের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা:
ইসলামি আকিদার মূল স্তম্ভগুলো সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে বিশ্বখ্যাত ‘হাদিসে জিবরাইল’-এ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের মাঝে উপবিষ্ট থাকা অবস্থায় এক আগন্তুক এসে একে একে ইমান, ইসলাম, ইহসান ও কেয়ামত সম্পর্কে জানতে চান।
নবী করিম (সা.) ব্যাখ্যা করে জানান—
- ইমান: আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাকুল, কেয়ামতের দিন তাঁর সাক্ষাৎ, রাসুলগণ এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি অকপট বিশ্বাস স্থাপন করা।
- ইসলাম: আল্লাহর একত্ববাদের ইবাদত করা ও শরিক না করা, নিয়মিত নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা এবং রমজানের রোজা পালন করা।
- ইহসান: এমন গভীর নিষ্ঠা ও একাগ্রতায় আল্লাহর ইবাদত করা যেন বান্দা তাঁকে সরাসরি দেখছে; আর তা অনুভব করতে না পারলে মনে রাখা যে, মহান আল্লাহ বান্দাকে সবসময় দেখছেন।
কেয়ামতের সুনির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে রাসুল (সা.) জানান, এ বিষয়ে প্রশ্নকারী ও উত্তরদাতার জ্ঞান সমান, কারণ কেয়ামতের সঠিক সময় কেবল আল্লাহর ইলমের অন্তর্ভুক্ত (সুরা লুকমান : আয়াত ৩৪)। তবে আলামত হিসেবে দাসীর গর্ভে মনিব জন্ম নেওয়া এবং রাখালদের সুউচ্চ অট্টালিকা তৈরির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেন। পরে রাসুল (সা.) প্রকাশ করেন, সেই আগন্তুক মূলত ছিলেন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.), যিনি মানুষদের দীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।
সরিষার দানা পরিমাণ ইমানের ফল্গুধারা ও জান্নাত লাভ:
কোনো বান্দার অন্তরে সামান্যতম ইমান অবশিষ্ট থাকলেও তা তাকে চূড়ান্ত ধ্বংস থেকে রক্ষা করবে। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত ঐতিহাসিক এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, জান্নাতিরা জান্নাতে এবং পাপীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন—‘যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ইমান রয়েছে, তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বের করে নিয়ে এসো।’ এরপর দীর্ঘ শাস্তিতে দগ্ধ হয়ে কয়লার মতো রূপ নেওয়া সেই মানুষদের ‘হায়াত’ বা সঞ্জীবনী নদীতে অবগাহন করানো হবে। ফলে নদীর তীরে দ্রুত ঘাস যেভাবে গজিয়ে ওঠে, সেভাবে তারা পুনরুজ্জীবিত হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে (সহিহ বুখারি : হাদিস ২২)।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, বর্তমান সমাজের অবক্ষয় ও নৈতিক স্খলন থেকে মুক্তি পেতে অন্তরে লজ্জাশীলতার চর্চা বাড়ানো, ইমানের বুনিয়াদ মজবুত রাখা এবং ইসলাম ও ইহসানের সমন্বয়ে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি।





















