ধর্ম ও জীবন ডেস্ক, জনপদের খবর:
ইসলামি আকিদা ও পরকালের জীবনে ‘শাফাআত’ বা সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আভিধানিক অর্থে শাফাআত হলো কোনো একক বিষয়কে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করে জোড়া বানানো। পারিভাষিক অর্থে, অন্যের কোনো উপকার সাধন কিংবা কোনো ক্ষতি ও বিপদ দূর করার উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর দরবারে সুপারিশ বা মধ্যস্থতা করাকেই শাফাআত বলা হয়।
পরকালে শাফাআতের দুটি প্রধান দিক রয়েছে—ক্ষতি দূর করার শাফাআত (যেমন: কিয়ামতের কঠিন দিনে হিসাব-নিকাশ দ্রুত শুরুর জন্য আল্লাহর দরবারে রাসুলুল্লাহর সুপারিশ) এবং উপকার লাভের শাফাআত (যেমন: জান্নাতবাসীদের দ্রুত জান্নাতে প্রবেশের ব্যবস্থা করা)।
শরিয়তসম্মত শাফাআতের ৩টি আবশ্যিক শর্ত:
পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, শাফাআত কোনো স্বাধীন বিষয় নয়; বরং তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। এর জন্য তিনটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক:
- প্রথম শর্ত: শাফাআতকারী ব্যক্তির ওপর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকতে হবে।
- দ্বিতীয় শর্ত: যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তার ওপরও আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকতে হবে (তবে কিয়ামতের সাধারণ মানুষের হিসাব শুরুর মহাশাফাআত একটি বিশেষ ব্যতিক্রম)।
- তৃতীয় শর্ত: মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শাফাআত করার সুস্পষ্ট অনুমতি থাকতে হবে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘আকাশে কত ফেরেশতা আছে, তাদের সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার জন্য অনুমতি দেন এবং সন্তুষ্ট হন।’ (সূরা নাজম: ২৬)। আয়াতুল কুরসিতেও ঘোষণা করা হয়েছে—‘কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে?’ (সূরা বাকারা: ২৫৫)। অর্থাৎ আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো নবী, রাসুল বা ফেরেশতা নিজ ক্ষমতায় সুপারিশ করতে পারবেন না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআতের প্রকারভেদ:
হাদিস শরিফের আলোকে শেষ বিচারের দিনে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন শ্রেণিতে শাফাআত করবেন:
- ১. শাফাআতে কুবরা (মহাশাফাআত): কিয়ামতের ময়দানে দীর্ঘ অপেক্ষার পর মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে হিসাব শুরু করার জন্য নবীজি (সা.) আল্লাহর আরশের নিচে সিজদায় পড়ে সুপারিশ করবেন (সহিহ বুখারি: ৪৭১২)।
- ২. জাহান্নাম থেকে তাওহিদবাদীদের মুক্তি: অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান থাকা সত্ত্বেও গুনাহের কারণে যারা জাহান্নামে প্রবেশ করেছে, তাদের বের করে আনার জন্য সুপারিশ (ইবনে মাজাহ: ৫১)।
- ৩. নেকি ও গুনাহ সমান হওয়া ব্যক্তিদের জন্য: যাদের পুণ্য ও পাপ সমান হয়ে গেছে, তাদের জান্নাতে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে শাফাআত।
- ৪. জান্নাতিদের মর্যাদা বৃদ্ধি: জান্নাতে প্রবেশকারী ঈমানদারদের মর্যাদা ও স্তর আরও উন্নত করতে সুপারিশ।
- ৫. বিনা হিসাবে জান্নাত লাভ: হিসাব ছাড়াই যাতে বিশেষ ব্যক্তিরা জান্নাতে যেতে পারেন (যেমন: সাহাবি উক্কাশা ইবনু মুহসিন রা.-এর ঘটনা)।
- ৬. আবু তালিবের শাস্তি লাঘব: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ায় তাঁর চাচা আবু তালিবের জাহান্নামের শাস্তি কিছুটা হালকা করা হবে।
- ৭. কবিরা গুনাহকারী মুসলিমদের জন্য: নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমার শাফাআত আমার উম্মতের বড় গুনাহকারীদের জন্য।’ (আবু দাউদ: ৪৭৩৯)।
নবীজি (সা.)-এর শাফাআত লাভের দুটি বিশেষ আমল:
১. আজান শেষে দোয়া পাঠ: রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, যে ব্যক্তি আজান শোনার পর নির্ধারিত দোয়া পাঠ করবে (আল্লাহুম্মা রব্বা হাজিহিদ দাওয়াতিত তাম্মাহ…), কিয়ামতের দিন সে নবীজির শাফাআত লাভের অধিকারী হবে (সহিহ বুখারি: ৬১৪)।
২. অধিক পরিমাণে নফল নামাজ আদায়: হাদিস অনুযায়ী, প্রিয় নবী (সা.)-এর কাছে তাঁর এক খাদেম পরকালে সুপারিশের আর্জি জানালে তিনি তাকে বেশি বেশি নফল নামাজ (সিজদা) আদায়ের মাধ্যমে এ কাজে সাহায্য করার নির্দেশ দেন (মুসনাদে আহমদ: ১৬০৭৬, সহিহ মুসলিম)।

মোঃ আল আমিন কাজী 



















