অপরাধ বিষয়ক ডেস্ক:
২ থেকে ১০ গুণ লাভের প্রলোভন। শুরুতে মিলছে কিছু লাভের দেখাও। আর সেই লোভে পড়েই বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার সাইটে সর্বস্ব বিনিয়োগ করে রাতারাতি নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো মানুষ। কৃষক, দিনমজুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়াচ্ছেন এই সর্বনাশা নেশায়। চক্রটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, যা পরবর্তীতে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। ডিবি ও সিআইডির তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা এভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিদেশে বসে কলকাঠি, দেশে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মাসুদ ও আবু নোমান নামের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য পায়। জানা যায়, এই সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে, অবস্থান করছেন ভিনদেশে। চক্রের অন্যতম হোতা সুজন নেপালে এবং আকাশ দুবাইয়ে বসে কলকাঠি নাড়ছেন। শীতল নামের আরেক মূলহোতার অবস্থান এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, অনলাইন জুয়ার পুরো নেটওয়ার্কটি মাস্টার, সুপার এবং সাব-এজেন্টের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিচালিত হয়। চেইনের সদস্যরা একে অপরকে সরাসরি চেনেন না, তাদের সব আর্থিক লেনদেন ও সমন্বয় হয় টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে। কমিশনভিত্তিক এই ব্যবসায় বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে পুলিশের নজর এড়াতে মাস্টার এজেন্টরা দুবাই বা নেপালে পাড়ি জমান। জানা গেছে, এসব সাইটের সার্ভার মূলত রাশিয়া, সাইপ্রাস, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
আইটি দক্ষ তরুণদের বিপথগামিতা ও এমএফএসের অপব্যবহার
সাইবার প্যাট্রলিংয়ের মাধ্যমে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ইতিমধ্যে ৩০০টিরও বেশি এমএফএস (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) এজেন্ট নম্বর শনাক্ত করেছে, যেগুলোর মাধ্যমে জুয়ার কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছিল। এ ঘটনায় মামলা ও কয়েকজন এজেন্ট গ্রেপ্তার হলেও মূল সাইটগুলো বিদেশ থেকে পরিচালিত হওয়ায় তদন্তে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে আরেক উদ্বেগজনক চিত্র। কম্পিউটার সায়েন্স থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী কিংবা আইটি প্রশিক্ষণ নিয়ে বেকার থাকা অনেক দক্ষ তরুণ সাব-এজেন্ট হিসেবে এই অপরাধ চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রথমে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করে বিশ্বস্ততা অর্জনের পর তারা সাইট পরিচালনার সুযোগ পান এবং নিজেদের নামে নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করে আরও এজেন্ট নিয়োগ দেন।
কেউ নিঃস্ব, কারও বিলাসী জীবন
আন্তর্জাতিক বেটিং সাইটের ফাঁদে পড়ে একদিকে সাধারণ মানুষ যেমন জমিজমা ও সঞ্চয় হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে চক্রের সদস্যরা যাপন করছেন বিলাসবহুল জীবন। গত বছর সিটিটিসি অস্বাভাবিক লেনদেনের সূত্র ধরে ১২ জনকে শনাক্ত করে, যাদের বেশির ভাগই এখন দুবাইয়ে। ডিবি সম্প্রতি আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের মধ্যে একজনের দৈনিক ব্যক্তিগত ব্যয়ই ছিল লাখ টাকার ওপরে!
যা বলছেন বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, “নানা কারণে অনলাইন জুয়া এখন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ পেলেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে ভুক্তভোগীরা অনেক সময়ই আইনি পদক্ষেপ নিতে চান না। এরপরও আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে।”
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সাইফউদ্দীন শাহীন বলেন, “অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে আমাদের ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং চলছে। সম্প্রতি আটটির মতো মামলা রুজু হয়েছে। সাইবার পেট্রোলিংয়ে শনাক্ত হওয়া নতুন সাইটগুলোর বিরুদ্ধেও আমরা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “প্রলোভন, দুর্বল আইন প্রয়োগ ও শাস্তির অভাবের কারণেই অনলাইন জুয়া দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই প্রবণতা কোনোভাবেই কমবে না।”
(গুগল এডসেন্স ও সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে প্রতিবেদনে ক্ষতিকর বেটিং বা জুয়া সাইটগুলোর সরাসরি নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকা হয়েছে।)

মোঃ আল আমিন কাজী 



















