ডা. মো. আবু কাওছার স্বপন
একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি কতগুলো আধুনিক হাসপাতাল নির্মিত হলো, কত বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক তৈরি হলেন কিংবা কত উন্নত প্রযুক্তি চিকিৎসা সেবায় যুক্ত হলো—তার ওপর নির্ভর করে না। বরং একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য’ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যদি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে যত বিশ্বমানের হাসপাতালই গড়ে তোলা হোক না কেন, চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীর উপচে পড়া চাপ কোনোভাবেই কমানো সম্ভব নয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা এবং ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগের (NCD) প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামাজিক ব্যাধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাজারজুড়ে ভেজাল, রাসায়নিক-দূষিত ও নিম্নমানের খাদ্যের ব্যাপক বিস্তার। ফলমূলে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, মাছ ও মাংসে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি, দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজাল এবং অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাবার প্রতিনিয়ত মানবদেহে ধীরগতির বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে চলেছে।
খাদ্যে এই বিষাক্ততার কারণে আমাদের স্বাস্থ্যখাতে দুটি প্রধান সংকট দৃশ্যমান হয়ে উঠছে:
১. হাসপাতালের ওপর মারাত্মক চাপ: দ্রুতগতিতে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বিদ্যমান হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে।
২. অর্থনৈতিক বিপর্যয়: পরিবার এবং রাষ্ট্র—উভয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো জটিল রোগের চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
“হাসপাতালের সংখ্যা বাড়িয়ে কেবল রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব, কিন্তু রোগের উৎপত্তি বন্ধ করা যায় না। রোগের মূল উৎপাটন করতে হলে স্বাস্থ্যনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিরাপদ খাদ্যকে স্থান দিতে হবে।”
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্ব
একটি কার্যকর জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি কখনই শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রিক হতে পারে না; এটি হওয়া উচিত মূলত ‘প্রতিরোধমূলক’ (Preventive Healthcare)। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই হলো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। খাদ্য শৃঙ্খলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অর্ধেকেরও বেশি কমে আসবে, ওষুধের ব্যবহার কমবে এবং নাগরিকদের গড় কর্মক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
এই লক্ষ্য অর্জনে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:
- কঠোর আইন প্রয়োগ: খাদ্যে ভেজাল মেশানো এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) বজায় রেখে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
- উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ: কৃষক, খাদ্য উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব খাদ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া।
- ল্যাব ও বাজার তদারকি জোরদার: খাদ্য পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং নিয়মিত বাজার তদারকি (Mobile Court) চালুর মাধ্যমে খাদ্যের মান নিশ্চিত করা।
- ব্যাপক জনসচেতনতা: ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস ত্যাগ করে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে সর্বস্তরে সচেতনতা তৈরি করা।
- জাতীয় পলিসিতে অগ্রাধিকার: খাদ্য নিরাপত্তাকে কৃষি বা ভোক্তা অধিকারের গণ্ডি থেকে বের করে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করা।
খাদ্য নিরাপত্তা কেবল কৃষি কিংবা বাজার ব্যবস্থার সাধারণ বিষয় নয়; এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ভারী বোঝা সামলাতে গিয়ে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
(লেখক পরিচিতি: ডা. মো. আবু কাওছার স্বপন; জেনারেল প্রাকটিশনার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চায়না-অ্যালামনাই (অ্যাবকা) এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, লং লাইফ হাসপাতাল, ঢাকা।)

মোঃ আল আমিন কাজী 



















