
জনপদের খবর
ধর্মীয় ও ঐতিহ্য বিষয়ক ডেস্ক
তারিখ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬ | সময়: বিকেল ০৩:১৩
ঢাকা: শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে পবিত্র হজ কেবল মুসলিম উম্মাহর একটি প্রধান ধর্মীয় আচারই ছিল না, বরং এটি ছিল এক অতুলনীয়, অবিস্মরণীয় এবং রোমাঞ্চকর মহাযাত্রা। আজকের আধুনিক যুগে বিমানে চড়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় মক্কায় পৌঁছানো সম্ভব হলেও, অতীতে এই যাত্রার প্রতিটি ধাপে ছিলো চরম কষ্টের পরীক্ষা। ইতিহাসের পাতায় সেই প্রাচীন কাফেলাগুলোর অবর্ণনীয় কষ্ট, ত্যাগ এবং পরম আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষার চিত্র নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তৎকালীন বিখ্যাত পরিব্রাজক ও ইতিহাসবিদরা। তাদের রেখে যাওয়া মূল্যবান বই ও পাণ্ডুলিপিগুলো আজ যুগের পর যুগ ধরে হজের বিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
প্রাচীনকালে পবিত্র মক্কার পুণ্যভূমিতে পৌঁছানো মোটেও সহজ কোনো কাজ ছিল না। একটি হজ যাত্রা সফলভাবে সম্পন্ন করতে তখনকার মানুষের কয়েক মাস থেকে শুরু করে পুরো এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেত। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ, মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশি আর মাইলের পর মাইল দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার সময় হাজিদের মুখোমুখি হতে হতো প্রকৃতির রুদ্ররূপ, মারাত্মক ঝড়-তুফান এবং জলদস্যু ও ডাকাতদের নানাবিধ জঘন্য আক্রমণের। এত সব বিপদের মুখোমুখি হয়েও শুধু আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও প্রেমের টানে কাফেলাগুলো এগিয়ে চলতো সামনের দিকে।
মুসলিম শাসকদের ঐতিহাসিক উদ্যোগ ও রুট ব্যবস্থাপনা
ইতিহাসবিদদের মতে, তৎকালীন মুসলিম শাসকরা হজের পথগুলোকে সুগম, নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাগদাদ থেকে বারবার হজে আসা বিখ্যাত আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদ এবং দামেস্ক ও কায়রো থেকে আসা কাফেলার নিরাপত্তার জন্য বিশেষ চকি ও রসদ সরবরাহ কেন্দ্র স্থাপনকারী সুলতান আল-জাহিরের নাম এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক যুগের ইসলামিক রাষ্ট্রগুলো যে হজের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও হাজিদের নিরাপত্তাকে কতটা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিত, এই ঐতিহাসিক উদ্যোগগুলো তারই অন্যতম প্রমাণ বহন করে।
ইরাকের বিখ্যাত ‘দারব যুবায়দাহ’ কিংবা মিশরের প্রাচীন হজ রুটগুলোর পাশে হাজিদের কল্যাণে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ছোটখাটো শহর, সরাইখানা ও বিশ্রামাগার। এই পথগুলো কেবল হজের জন্যই ব্যবহৃত হতো না, বরং এগুলো ছিল গোটা মুসলিম বিশ্বের সংস্কৃতি, জ্ঞান ও বাণিজ্যের মূল ধমনী, যা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল।
প্রাচীন হজ ব্যবস্থাপনা: আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রাথমিক রূপ
হাজিদের সুবিধার্থে তৎকালীন সময়ে পথিমধ্যে কৃত্রিম জলাশয় ও কূপ খনন, খাবারের ঘর নির্মাণ, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং চিকিৎসাসেবার যে চমৎকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাকে আধুনিককালের বড় জনসমাবেশ ব্যবস্থাপনার একটি প্রাথমিক রূপরেখা বলা চলে। তৎকালীন প্রখ্যাত পরিব্রাজক আবদ আল-গনি আল-নাবুলসির লেখায় হাজিদের মধ্যকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের যে অসামান্য চিত্র পাওয়া যায়, তা যেন বহু শতক আগেই আধুনিক যুগের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ধারণাকে প্রস্ফুটিত করেছিল।
পরবর্তীতে ‘ফি মানজিল আল-ওয়াহি’, ‘দ্য রোড টু মক্কা’ কিংবা ‘টু দ্য ল্যান্ড অব প্রফেথহুড’-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থগুলো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে হজের মানবিক ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছে। ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও যুগে লেখা হলেও এই বিবরণগুলো হজের বিবর্তনের এক অনন্য জীবন্ত দলিল।
ইবনে জুবায়ের ও ইবনে বতুতার চোখে প্রাচীন হজ
গবেষকদের মতে, হজের এই ভ্রমণকাহিনীগুলো তৎকালীন ইসলামি সমাজের সামাজিক বাস্তবতার অন্যতম প্রধান উৎস। যেমন— আন্দালুসিয়া (বর্তমান স্পেন) থেকে হিজাজে আসা বিখ্যাত পর্যটক ইবনে জুবায়ের তাঁর ডায়েরিতে সমুদ্রযাত্রা এবং পরবর্তী স্থলপথের নিখুঁত বিবরণ রেখে গেছেন। তাঁর লেখনীতে ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান এবং জামরায় পাথর নিক্ষেপের মতো প্রতিটি ধর্মীয় আচারের আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক রূপ ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে, ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পরিব্রাজক ইবনে বতুতার ডায়েরি আমাদের দেখায় হজের পথের অস্থায়ী বাজার, চিকিৎসকদের তাঁবু এবং বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণের মুসলিমদের অভূতপূর্ব একাত্মতা। যুগের পর যুগ ধরে এই অমূল্য স্মৃতি ও ভ্রমণকাহিনীগুলোই হজ যাত্রার সেই প্রাচীন ও গৌরবময় ইতিহাসকে আজও মানুষের মনে অম্লান ও জীবন্ত করে রেখেছে।