জনপদের খবর অনলাইন সংস্করণ | ঢাকা
তারিখ: শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ | সময়: সকাল ১১:১৫ মিনিট
মো: নাসিরউদ্দিন, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর তানোরে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। নিজের পাকা ঘরবাড়ি থাকার পরেও আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতির নিজেরসহ তাঁর স্ত্রী, পুত্র ও দুই ভাইয়ের নামে ৫টি ঘর বাগিয়ে নেওয়ার তথ্য ফাঁস হয়েছে। শুধু তাই নয়, সভাপতির আরও অন্তত ১৫ জন নিকট আত্মীয়কে নিয়মবহির্ভূতভাবে দেওয়া হয়েছে ঘর। অথচ দলিল থাকার পরেও মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে অন্যের জমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন প্রকৃত ভূমিহীনরা।
নেপথ্যে ৪ একরের পুকুর নিয়ন্ত্রণ!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নের (ইউআর) ভান্ডইল মৌজায় ৮০ নম্বর দাগে ৪ দশমিক ১১ একর আয়তনের একটি বিশাল সরকারি পুকুর এবং ৮১ নম্বর দাগে প্রায় ৩৮ বিঘা সরকারি খাস সম্পত্তি রয়েছে। ২০০৭ সালে এই ভান্ডইল গ্রামে প্রথম টিনের বেড়া দিয়ে ৫০টি ভূমিহীন পরিবারের মাঝে আশ্রয়ণের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে গত ২০২৫ সালে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় জরাজীর্ণ সিআইসিট ব্যারাকের স্থলে সেমিপাকা একক গৃহনির্মাণ প্রকল্পের অধীনে ৪৩টি ঘর নতুন করে নির্মাণ করা হয়।
এর মধ্যে ৩৯টি ঘর ইতিমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ৪টি ঘর এখনো খালি রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন ও হস্তান্তর করার পরপরই স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে এবং বেরিয়ে আসে অনিয়মের নানা চিত্র।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রকাশ্য অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৪ দশমিক ১১ একর আয়তনের বিশাল সরকারি পুকুরটির একক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতেই আতিকুল ইসলাম কৌশলে আশ্রয়ণের সভাপতি হয়েছেন। কারণ ওই পুকুর থেকে বছরে মাছ চাষ করে আয় হয় প্রায় ৬ লাখ টাকা। আতিকুল পুরো পুকুর নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে আশ্রয়ণের সাধারণ বাসিন্দাদের নামমাত্র সুবিধা দিয়ে বছরের পর বছর লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরছেন। এই পুকুরের দখল পোক্ত করতেই তিনি নিজের ক্ষমতার জোরে নিজের নামে, স্ত্রী, পুত্র হৃদয় এবং দুই ভাই শফিকুল ও জহুরুল ইসলামের নামে সরকারি ঘর বরাদ্দ নিয়েছেন।
দলিল আছে, ঘর নেই
বাস্তব চিত্র আরও করুণ। তালিকায় নাম থাকা এবং ঘরের রেজিস্ট্রি দলিল (৯৯ বছরের লিজ) থাকার পরেও ঘর পাননি মৃত শমসের আলীর স্ত্রী সোনাভান (৫৫) এবং মৃত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী মরিজান বেওয়া। একইভাবে তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও ঘর থেকে বঞ্চিত হয়েছেন আক্তার আলীর ছেলে শাকিল আলী, জামিলুরের ছেলে সারোয়ার ও মৃত রহমানের ছেলে সেকেন্দার আলী।
অথচ অদ্ভুতভাবে পারুল নামের এক নারীর অন্য গ্রামে (উচাডাঙা) বিয়ে হয়ে চলে যাওয়ার পরও তাঁর নামে ঘর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আবার একই সাথে রাকিব ও তাঁর মেয়ে রুনার নামে আলাদা ঘর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আকতার বানু নামের এক নারীর নামে ঘর বরাদ্দ থাকলেও সেই ঘরে বছরের পর বছর ধরে কোনো মানুষ থাকে না, সেটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বসবাস করে আসা সোনাভান (৫৫) কান্নাভেজা কণ্ঠে ‘জনপদের খবর’-কে বলেন, “নতুন ঘর বানানোর জন্য আমার পুরনো টিনের ঘরটি ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু নতুন ঘর হওয়ার পর আমার কপালে আর ঘর জোটেনি। এখন আমি নিরুপায় হয়ে অন্যের জমির ওপর (কবরস্থান) খড় ও পলিথিন দিয়ে ছোট ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে দিন কাটাচ্ছি। দুনিয়ায় আমার দেখার কেউ নেই। অন্যরা যখন একই পরিবারে চার-পাঁচটা করে পাকা ঘর পাচ্ছে, সেখানে আমার মতো একলা বৃদ্ধার কথা কেউ একটা বারও চিন্তা করল না!”
সভাপতি ও প্রশাসনের বক্তব্য
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি আতিকুল ইসলাম নিজের বাড়ি থাকার কথা অকপটে স্বীকার করে বলেন, “আমার ঘরবাড়ি আছে এটা সত্যি, তবে সেটা সরকারি খাস জায়গার ওপর। সরকার যদি কোনোদিন আমার ওই ঘর ভেঙে দেয়, তখন আমি সপরিবারে কোথায় যাব? এই আশঙ্কায় আমি আশ্রয়ণের ঘর নিয়েছি।” পুকুরের বিষয়ে তাঁর দাবি, ৩৯টি পরিবার মিলেই তাঁরা পুকুর চাষ করেন।
এ বিষয়ে তানোর উপজেলার বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “যাদের পূর্বের ঘরসহ ৯৯ বছরের লিজ দেওয়া রয়েছে, নতুন নিয়মে তাদেরই অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। আর যাদের একবার ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাদের হুট করে বের করে দেওয়াও বেআইনি হবে। যদি কোনো প্রকৃত গৃহহীন বাদ পড়ে থাকে, তবে তাদের নতুন করে বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে হবে।” তিনি আরও জানান, তিনি এই উপজেলায় নতুন যোগদান করেছেন। তাই পূর্ববর্তী সময়ে যারা এই বরাদ্দের দায়িত্বে ছিলেন, তারাই এই অসংগতির বিষয়ে সঠিক বলতে পারবেন। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।

মোঃ আল আমিন কাজী 






















