নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনা মহানগরীর নিরালা এলাকায় প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় অজ্ঞাতনামা এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে পারিবারিক কলহের জের ধরে ১৬ বছর বয়সী ওই কিশোরীকে হত্যার পর মরদেহ গুম করার চেষ্টা করেছিলেন তার আপন জন্মদাত্রী মা!
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচনসহ নিহতের মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে খুলনা সদর থানা পুলিশ। আদালতে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
শনিবার (১১ জুলাই) খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ ও পরিচয় শনাক্ত
পুলিশ জানায়, গত ৮ জুলাই রাত আনুমানিক ৯টার দিকে খুলনা সদর থানাধীন প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডে একটি প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ অজ্ঞাতনামা ওই কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
প্রাথমিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় ১০ জুলাই খুলনা সদর থানা পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই, সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় পরিচয় শনাক্তের কাজ শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রচার ও বেতার বার্তার মাধ্যমে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভিকটিমের পরিচয় নিশ্চিত হয় পুলিশ। জানা যায়, নিহত কিশোরীর নাম আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬)। সে সোনাডাঙ্গা থানাধীন বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. আলিম হোসেন আকাশ ও আরিফা ইয়াসমিন সিমা দম্পতির কন্যা।
জিজ্ঞাসাবাদে মায়ের লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিহতের বসুপাড়ার বাসায় যান। সেখানে তার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে পুলিশকে বিপথগামী করার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি ভেঙে পড়েন এবং হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন।
স্বীকারোক্তিতে তিনি জানান, মেয়ে নির্জনা বিভিন্ন ছেলেদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। এ নিয়ে মা-মেয়ের মধ্যে চরম পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হয়। এই কলহের জেরেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় নির্জনা। হত্যার পর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নিহতের বাবা ও মা মিলে মরদেহ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় ফেলে আসেন।
গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ
কেএমপি কমিশনার মো. জাহিদুল হাসান, বিপিএম-সেবা-এর দিকনির্দেশনায় ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল ১০ জুলাই ঘাতক মা সিমাকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তিনি স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপর আসামি, নিহতের বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক অ্যান্ড প্রটোকল) মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ, অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর) এম. এম শাকিলুজ্জামান, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমান, অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন, সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম এবং খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলামসহ খুলনার বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।

মোঃ আল আমিন কাজী 



















