ক্রীড়া প্রতিবেদক:
এ পর্যন্ত কতবার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন? পরিসংখ্যানে কে এগিয়ে?
ফুটবল বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে চর্চিত এবং রোমাঞ্চকর বিষয়গুলোর একটি হলো ‘ফিনালিসিমা’। একদিকে লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ধরে রাখা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইউরোপের নতুন রাজা স্পেন। সদ্য সমাপ্ত কোপা আমেরিকা ২০২৪-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা এবং উয়েফা ইউরো ২০২৪-এর শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে লামিনে ইয়ামালের স্পেন। নিয়ম অনুযায়ী, এই দুই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফুটবলের আরেকটি মহারণ—ফিনালিসিমা।
এই ম্যাচের কথা সামনে আসতেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঁকি দিচ্ছে—ফুটবলের এই দুই পরাশক্তি এ পর্যন্ত কতবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে? আর যখনই তারা মাঠে নেমেছে, তখন জয়ের হাসি হেসেছে কোন দল? পরিসংখ্যানের পাতা ঘাটলে আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের দ্বৈরথের এক দারুণ রোমাঞ্চকর ইতিহাস চোখে পড়ে। চলুন, আজ বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মুখোমুখি লড়াইয়ের আদ্যোপান্ত।
পরিসংখ্যানের পাতায় আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন
আর্জেন্টিনা এবং স্পেন—উভয় দলই ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশের হওয়ায় তাদের মধ্যে নিয়মিত দেখা হওয়ার সুযোগ খুব একটা থাকে না। সাধারণত ফিফা বিশ্বকাপ অথবা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ ছাড়া এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার তেমন কোনো টুর্নামেন্ট নেই। তবে ফুটবল ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যে কয়বার তারা একে অপরের মোকাবিলা করেছে, প্রতিটি ম্যাচেই ছড়িয়েছে দারুণ উত্তেজনা।
অফিসিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা এবং স্পেন এ পর্যন্ত মোট ১৪ বার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে। এই ১৪টি ম্যাচের পরিসংখ্যান দেখলে আপনি অবাক হবেন, কারণ দুই দলের লড়াইটা একেবারে হাড্ডাহাড্ডি।
১৪টি ম্যাচের মধ্যে:
আর্জেন্টিনা জিতেছে: ৬ বার
স্পেন জিতেছে: ৬ বার
ম্যাচ ড্র হয়েছে: ২ বার
গোল করার দিক থেকেও দল দুটির মধ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য। এই ১৪ ম্যাচে স্পেন আর্জেন্টিনার জালে বল জড়িয়েছে মোট ১৯ বার, আর আর্জেন্টিনা স্পেনের জালে গোল করেছে ১৮ বার। অর্থাৎ, পরিসংখ্যানে কোনো দলই কাউকে এক চুলও ছাড় দেয়নি। যখনই তারা মাঠে নেমেছে, সমানে সমান লড়াই হয়েছে।
বিশ্বমঞ্চে এবং শুরুর দিকের লড়াই
আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার প্রথম আন্তর্জাতিক লড়াইটি হয়েছিল আজ থেকে কয়েক দশক আগে। স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত সেই প্রীতি ম্যাচগুলোতে দুই দলই নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছিল। তবে বিশ্বকাপ মঞ্চে এই দুই দলের দেখা হয়েছে মাত্র একবার।
১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও স্পেন। সেই ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর স্পেন ২-১ গোলের ব্যবধানে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে। এরপর থেকে বিশ্বকাপের মতো বড় কোনো টুর্নামেন্টে আর তাদের দেখা হয়নি। বাকি যে ১৩ বার তারা মুখোমুখি হয়েছে, তার সবগুলোই ছিল আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ অথবা প্রীতি টুর্নামেন্ট।
২০১০: বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে আর্জেন্টিনার চমক
আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের লড়াইয়ের কথা উঠলে ২০১০ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের ম্যাচটির কথা আলাদাভাবে বলতেই হয়। স্পেন তখন সদ্য দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। জাভি, ইনিয়েস্তা, ডেভিড ভিয়া, কাসিয়াসদের নিয়ে গড়া সেই স্প্যানিশ দলটিকে তখন মনে করা হতো ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল, যাদের ‘টিকি-টাকা’ ফুটবল জাদুতে মুগ্ধ ছিল পুরো বিশ্ব।
বিশ্বকাপ জয়ের মাত্র দুই মাস পর বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টালে আর্জেন্টিনার আতিথ্য গ্রহণ করে স্পেন। ঘরের মাঠে সেদিন বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রীতিমতো নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধেই মেসি, গঞ্জালো হিগুয়েইন এবং কার্লোস তেভেজের গোলে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৪-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। স্পেনের সেই সোনালী প্রজন্মের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই দাপুটে জয় আজও ফুটবল ভক্তদের মনে গেঁথে আছে।
২০১৮: স্পেনের মাঠে আর্জেন্টিনার দুঃস্বপ্ন
২০১০ সালে আর্জেন্টিনা যেমন স্পেনকে চমকে দিয়েছিল, ঠিক তার প্রতিশোধ যেন স্পেন নিয়েছিল ২০১৮ সালে। রাশিয়া বিশ্বকাপের ঠিক আগে, ২০১৮ সালের ২৭ মার্চ স্পেনের মাদ্রিদে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয় দুই দল। ইনজুরির কারণে সেই ম্যাচে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখেছিলেন লিওনেল মেসি।
মেসিবিহীন আর্জেন্টিনা সেদিন স্পেনের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। ইসকোর দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকের সুবাদে স্পেন সেদিন আর্জেন্টিনাকে ৬-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় পরাজয়ের একটি। ডিয়েগো কস্তা, থিয়াগো আলকানতারা এবং ইয়াগো আসপাসও স্পেনের হয়ে একটি করে গোল করেছিলেন। গ্যালারিতে বসে থাকা মেসির হতাশাজনক চাহনি সেদিন বুঝিয়ে দিয়েছিল, স্পেনের মাটিতে কতটা অসহায় ছিল তার দল।
ফুটবল শৈলীর ভিন্নতা: লাতিন ছন্দ বনাম পজেশনাল প্লে
আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের লড়াই শুধু দুটি দেশের লড়াই নয়, বরং এটি দুটি ভিন্ন ফুটবল দর্শনের লড়াই। আর্জেন্টিনা ঐতিহ্যগতভাবে লাতিন আমেরিকার ছন্দময়, গতিশীল এবং ব্যক্তিগত স্কিলের ওপর নির্ভরশীল ফুটবল খেলে থাকে। অন্যদিকে, স্পেনের ফুটবল মানেই হলো পজেশন ধরে রাখা, ছোট ছোট পাসে বল দেওয়া-নেওয়া এবং ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে ফেলা।
মাঠে যখন এই দুই ভিন্ন শৈলীর দলের দেখা হয়, তখন ফুটবল হয়ে ওঠে শিল্পের মতো। স্পেনের মিডফিল্ডের বল দখলের লড়াইয়ের বিপরীতে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের ক্ষিপ্রতা—সব মিলিয়ে এই ম্যাচগুলো দর্শকদের দারুণ বিনোদন দেয়।
আসন্ন ফিনালিসিমা: নতুন এক ইতিহাসের অপেক্ষা
বর্তমানের প্রেক্ষাপট আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা এখন অপ্রতিরোধ্য। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ জয়ের পর টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপা আমেরিকা জিতে তারা প্রমাণ করেছে কেন তারা বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর দল।
অন্যদিকে, লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন পেয়েছে নতুন এক সোনালী প্রজন্মের দেখা। লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রিদের মতো তরুণ তুর্কিরা যেভাবে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে দাপট দেখিয়েছে, তা পুরো বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির সাথে স্পেনের নতুন সেনসেশন লামিনে ইয়ামালের লড়াই।
পরিসংখ্যান বলছে, আর্জেন্টিনা ও স্পেন সমানে সমান। অতীত ইতিহাস বলছে, কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। এখন শুধু অপেক্ষা ফিনালিসিমার বাঁশি বাজার। স্পেনের টিকিটাকার আধুনিক সংস্করণ নাকি আর্জেন্টিনার লাতিন জেদ—কে হাসবে শেষ হাসি? উত্তরটা পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সেই মহেন্দ্রক্ষণের

মোঃ আল আমিন কাজী 


















