নিজস্ব প্রতিবেদক, জনপদের খবর:
খালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঝকঝকে এক সেতু। অথচ সেই সেতুতে ওঠার জন্য দুই পাশে নেই কোনো সংযোগ সড়ক! বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি নড়বড়ে সাঁকো বেয়ে জীবনের ঝুঁকিতে সেতুতে উঠছেন। এমন অদ্ভুত ও হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের বড়াইকান্দি গ্রামে। সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি কোনো কাজেই আসছে না, উল্টো চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ওই এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অধিদপ্তরের অধীনে বড়াইকান্দি খালের ওপর এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্থের সেতুটির নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। মেসার্স রামিম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজ পায়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কাজ শুরু হয়ে জুনের মধ্যেই তা শেষ হয়। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী সেতুর উভয় পাশে মাটি ভরাট করে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কথা থাকলেও, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা করেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পুরো বিল তুলে নিয়ে গেছে।
সরেজমিনে দুর্ভোগের চিত্র
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বড়াইকান্দি খালের ওপর নির্মিত সেতুটির দুই প্রান্তে মাটি নেই, রয়েছে গভীর গর্ত ও অসমতল অংশ। ফলে কোনো যানবাহন তো দূরের কথা, পায়ে হেঁটে ওঠাও অসম্ভব। উপায় না দেখে এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো বানিয়েছেন সেতুতে ওঠার জন্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিও এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এলাকার বয়স্ক ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বাঁশের সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার শঙ্কা বিরাজ করছে।
কী বলছেন ভুক্তভোগীরা?
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোটি টাকার সেতু হয়েছে, কিন্তু সেতুতে ওঠার রাস্তা নেই। বাধ্য হয়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যায়। সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকি, কখন কে পানিতে পড়ে যায়!”
কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান জানান তার দৈনন্দিন কষ্টের কথা। তিনি বলেন, “এই পথ দিয়েই আমাদের বাজারে যেতে হয়। কৃষিপণ্য কখনো ঘাড়ে, কখনো মাথায় করে সেতু পার করতে হয়। সংযোগ সড়ক থাকলে ভ্যান বা সাইকেলে করে নেওয়া অনেক সহজ হতো।”
বর্ষার দুর্ভোগ নিয়ে কলেজ শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান বলেন, “বর্ষা এলেই ভয় আরও বেড়ে যায়। সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেতু নির্মাণ করা হলেও আমরা এর কোনো সুফলই পাচ্ছি না।”
কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও বক্তব্য
স্থানীয়রা একাধিকবার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) বিষয়টি জানালেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রামিম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মশিউর রহমানের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি। তিনি বলেন, “খালে পানি থাকায় সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। ঠিকাদারকে দ্রুত বাকি কাজ শেষ করার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
কাজ শেষ না করেই বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, “যতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে, ঠিক ততটুকুর বিপরীতেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে।”

মোঃ আল আমিন কাজী 



















