মো. আল আমিন কাজী, বিশেষ প্রতিনিধি:
দেশের পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা প্রান্তিক শিশুদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিচ্ছে সরকার। তাদের আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রায় ৪২০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ‘পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন সুবিধাসহ পুনর্বাসন প্রকল্প’ শীর্ষক এই মানবিক ও যুগান্তকারী উদ্যোগটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমি।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে (জিওবি) চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত রবিবার (৫ জুলাই) অনুমোদনের জন্য এই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবটি (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
আশ্রয়, শিক্ষা ও স্বাবলম্বী করার বহুমুখী রূপরেখা
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো—সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা এবং তাদের কর্মমুখী করে তোলা। ডিপিপির তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ৬০০ শিশুকে পুনরায় তাদের পরিবার ও সমাজের সঙ্গে একীভূত করা হবে। পাশাপাশি ১ হাজার ৯০০ পথশিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং ৪ হাজার ৫০০ শিশুকে আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় আনা হবে।
শিশুদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে বহুমুখী পরিকল্পনা। শেল্টার হোমে অবস্থানরত আগ্রহী শিশুদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যারা উদ্যোক্তা হতে চায়, তাদের এককালীন আর্থিক অনুদান কিংবা সমমূল্যের প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম দেওয়া হবে। এছাড়া ৫ হাজার ৭০০ পথশিশুকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং ৫ হাজার ৫০০ শিশু বা তাদের পরিবারকে শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা (কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার) দেওয়া হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এবং ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করে দেওয়া হবে।
যেসব এলাকায় চলবে কার্যক্রম
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’-এর তথ্যের ভিত্তিতে মূলত যেসব এলাকায় পথশিশুর সংখ্যা বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্প এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩১টি জেলা, ৩৪টি উপজেলা এবং ৮টি পৌরসভায় এটি বাস্তবায়িত হবে। সাভার, গজারিয়া, সন্দ্বীপ, ভৈরব, ভালুকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত রয়েছে।
কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সারা দেশে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র (শেল্টার হোম), ৩টি ট্রানজিট হোম, ১৫০টি উন্মুক্ত পথশিশু স্কুল এবং ১৫টি কাউন্সেলিং বুথ স্থাপন করা হবে। একইসঙ্গে বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ তৈরি ও প্রত্যেক শিশুর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা হবে। সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে পালক পরিবার (ফস্টার ফ্যামিলি) নির্বাচন করেও শিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কেন পথে নামছে শিশুরা?
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দারিদ্র্য, বন্যা, খরা, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পারিবারিক কলহ ও সহিংসতার কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবিকার সন্ধানে শহরে চলে আসে। জীবিকার তাগিদে তারা আবর্জনা সংগ্রহ, হকারি, কুলির কাজের পাশাপাশি অনেক সময় মাদক পরিবহন, চুরি ও পকেটমারের মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
বিবিএস-এর জরিপে দেখা গেছে, দারিদ্র্য ও ক্ষুধার কারণেই মূলত ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু পথে নামে। তবে আশার কথা হলো, ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ পথশিশুর বাবা-মা জীবিত এবং ৯১ দশমিক ২ শতাংশ শিশুই পুনরায় পরিবারের সঙ্গে ফিরে যেতে চায়। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে এবং শিশু অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে ১২৫টি ইউনিয়নে পথনাটক, গম্ভীরা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন প্রচারণামূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ব্রাজিল, ভারত ও সিয়েরা লিওনের সফল পুনর্বাসন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রণীত এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ৫ লাখ শিশু উপকৃত হবে।

মোঃ আল আমিন কাজী 



















